যে রাজনৈতিক দলের ইতিহাস বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে
চট্টলা ডেক্স:
সাহস, সংগ্রাম, ত্যাগ, প্রতিরোধ আর সাফল্যের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ৪৮ বছরে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে রাজনৈতিক দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল, নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম, রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া, বিরোধী দলে থাকা এবং অসংখ্য নেতাকর্মীর ত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই বিএনপি আজ বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর প্রতি রইল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। একই সঙ্গে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে এবং গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী দলের অগণিত নেতাকর্মীকে।
ক্রান্তিকালের বাংলাদেশ ও বিএনপির জন্ম
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এক গভীর অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এর আগে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় গভীর সংকট।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির সুযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
দীর্ঘ আলোচনা, মতবিনিময় ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে এক অনাড়ম্বর সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণাপত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
বিএনপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনৈতিক দর্শন এবং ১৯ দফা কর্মসূচি। দলটির ঘোষণাপত্রে জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিকেন্দ্রীকরণ ও যুবশক্তিকে দেশ গঠনে কাজে লাগানোর মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
জিয়ার রাজনীতি: উন্নয়ন, উৎপাদন ও জাতীয়তাবাদ
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে উৎপাদন ও আত্মনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করা। তাঁর সময়ে কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ববহুদলীয় গণতন্ত্র জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।
তবে বিএনপির প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শহীদ হন জিয়াউর রহমান। প্রতিষ্ঠাতা নেতার এই আকস্মিক মৃত্যু বিএনপির জন্য যেমন ছিল গভীর শোকের, তেমনি দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও ছিল এক কঠিন পরীক্ষা।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে সামনে আসেন তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে তিনি শুধু দলের চেয়ারপারসনই হননি, বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে দীর্ঘ সময় বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব বিএনপিকে রাজপথের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর এরশাদ সরকারের পতন এবং পরবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী সময়েও ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। বিভিন্ন মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময়ে নারীশিক্ষা, গ্রামীণ অবকাঠামো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
রাজপথের দল, আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাস নয়, এটি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামেরও ইতিহাস।
দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছেন। সেই আন্দোলনে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আবার অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন।
বিএনপির দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতিতে থাকার সময়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা মামলা, গুম-খুন, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের নানা অভিযোগ দলটির রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে। সেই কঠিন সময়েও দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্ব ধরে রাখা এবং রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকা বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রামের অন্যতম দৃষ্টান্ত।
তারেক রহমান: নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব
জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলটির সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা, তৃণমূলকে সক্রিয় করা এবং দলীয় কর্মসূচিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
২০২৬ সালে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন দলটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক বর্ণনা অনুযায়ী, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দলটি আবার সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।
৪৮ বছরে বিএনপি: যেমন আছে অর্জন , তেমনি আছে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন
একটি রাজনৈতিক দলের ৪৮ বছরের ইতিহাস কখনোই একরৈখিক নয়। বিএনপির ইতিহাসেও রয়েছে সাফল্য, জনপ্রিয়তা, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও গণআন্দোলনের গৌরব, পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক, সমালোচনা এবং কঠিন সময়ের নানা অধ্যায়।
কিন্তু দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকা নিঃসন্দেহে দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ভিত্তির প্রমাণ।
আজকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীতের গৌরব স্মরণের দিন নয়, এটি ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা নতুন করে স্মরণ করারও দিন।
জনগণের ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ সংগ্রাম সত্যিকার অর্থে সার্থক হয়।
জনগণই শক্তির উৎস
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস। সেই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ক্ষমতার কেন্দ্রে জনগণকে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত বার্তাতেও দলটি গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বাংলাদেশকে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছে।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। ৫ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়েছে।
ইতিহাসের পথ ধরে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি দেখেছে প্রতিষ্ঠাতার উত্থান, তাঁর মর্মান্তিক বিদায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণআন্দোলন, একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনা, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি এবং কঠিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতা।
এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি বাঁকে দলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো নেতাকর্মীর আবেগ, ত্যাগ ও প্রত্যাশা।
তাই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাদিবস নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের স্মারক।
সাহস থেকে সংগ্রাম, সংগ্রাম থেকে আত্মত্যাগ, আত্মত্যাগ থেকে অর্জন এই দীর্ঘ পথ পেরিয়েই বিএনপি আজ ৪৮ বছরে।
আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু কোনো একটি দলের কাছে নয় এটি পুরো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তবু বিএনপির জন্য আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটাই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে অর্জিত জনগণের আস্থা ধরে রাখা এবং সেই আস্থাকে একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তব অর্থে রূপ দেওয়া।
কারণ একটি দলের প্রকৃত সাফল্য শুধু কত বছর টিকে থাকল, কতবার ক্ষমতায় গেল কিংবা কত বড় সংগঠন তৈরি করল তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় জনগণের জীবনে সেই দলের অবদান কতটা স্থায়ী ও ইতিবাচক হয়ে থাকে, তার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই অতীতের গৌরবের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রত্যয়ের আহ্বান গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সুশাসন ও মানুষের কল্যাণের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।
৪৮ বছরে বিএনপি সংগ্রামের ইতিহাস, ত্যাগের ইতিহাস, রাজনীতির ইতিহাস, আর একই সঙ্গে একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের নাম।
সিএক্স/রয়েল






