চট্টলা এক্সপ্রেস ডেস্ক:
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘটল। ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর প্রায় দুই দশক ধরে দেশের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন ফুটবলের এই মহাতারকা। বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকার শিরোপা, ফাইনালিসিমা, অলিম্পিক স্বর্ণ আর্জেন্টিনার হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব বড় সাফল্যই ছুঁয়েছেন তিনি।
মেসির বিদায়ের ঘোষণায় আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় সংস্থাটি মেসির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁর নেতৃত্ব ও অবদানের কথা স্মরণ করেছে। তাঁকে ‘অধিনায়ক’ সম্বোধন করে এএফএ জানায়, মেসির দেওয়া স্মৃতি ও তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আর্জেন্টাইনদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। এর আগে একই বছর আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপজয়ী দলের হয়েও আলো ছড়ান তিনি। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার হয়ে জেতেন স্বর্ণপদক।
তবে সিনিয়র জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকটা ছিল হতাশায় ভরা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয় বারবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে।
২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি ভালোবাসা তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে জাতীয় দলে। সেই প্রত্যাবর্তনের পরই শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালি অধ্যায়।
২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফিখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপাও আসে এই টুর্নামেন্টে।
এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালিসিমা জেতে আর্জেন্টিনা। একই বছর কাতার বিশ্বকাপে আসে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ফ্রান্সকে নাটকীয় ফাইনালে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেন তিনি। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জেতেন গোল্ডেন বল।
বিশ্বকাপ জয়ের পরও থামেনি মেসি-আর্জেন্টিনার সাফল্যের পথচলা। ২০২৪ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। ফলে জাতীয় দলের হয়ে মেসির ট্রফির তালিকায় যোগ হয় আরও একটি বড় অর্জন।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক ট্রফি
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বড় অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে
ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ: ২০০৫
অলিম্পিক স্বর্ণপদক: ২০০৮
কোপা আমেরিকা: ২০২১
ফাইনালিসিমা: ২০২২
ফিফা বিশ্বকাপ: ২০২২
কোপা আমেরিকা: ২০২৪
অর্থাৎ বয়সভিত্তিক দল ও অলিম্পিকসহ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক শিরোপার ঝুলিতে রয়েছে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অলিম্পিক স্বর্ণ, দুই কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ।
শুধু শিরোপাতেই থেমে নেই মেসির আন্তর্জাতিক কীর্তি। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তিনিই দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপেও গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড। পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ড এবং গোল-অ্যাসিস্টে অসাধারণ অবদান সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসেও নিজের নামকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির দীর্ঘ পথচলায় ছিল আনন্দের পাশাপাশি গভীর হতাশাও। একাধিক ফাইনালে হার, সমালোচনা এবং অবসরের ঘোষণা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সফল প্রজন্মের নেতা।
নিজের বিদায়ী বার্তায় মেসি জানিয়েছেন, জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ এই যাত্রায় সমর্থকদের ভালোবাসা, পরিবার, সতীর্থ, কোচ ও কর্মকর্তাদের অবদানের কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। ভবিষ্যতে মাঠের বাইরে থেকেও আর্জেন্টিনার একজন সমর্থক হিসেবে দলের পাশে থাকার প্রত্যয় জানিয়েছেন তিনি।
মেসির বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়। যে খেলোয়াড়কে ক্যারিয়ারের একসময় বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই মেসির হাত ধরেই আর্জেন্টিনা পেয়েছে কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা ও বহুল কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।
দুই দশকের সেই যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাই মেসির বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয় এটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় এক যুগের সমাপ্তি।
এএফএর আবেগঘন সেই কথাই যেন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত উপসংহার ‘ধন্যবাদ, অধিনায়ক।’
সিএক্স/রয়েল






