চট্টলা ডেক্স:
পুলিশের কাজে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা পৃথক দুই মামলায় বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী ওরফে চন্দন কুমার ধরের জামিন মঞ্জুর করেছেন হাইকোর্ট।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কে এম জাহিদ সরওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ আদেশ দেন। চিন্ময়ের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য। তিনিই জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এই দুই মামলায় জামিন পেলেও এ মুহূর্তে কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। তার বিরুদ্ধে আরও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ছয়টি ফৌজদারি মামলার মধ্যে চারটিতে এখন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আগে দেওয়া জামিনের আদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলার বিচারও চলছে।
আজকের জামিন কোন দুই মামলায়
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় পুলিশের কাজে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করা হয়। এসব মামলায় বিচারিক আদালতে জামিন না পেয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন চিন্ময়।
এর আগে এসব মামলায় তাকে জামিন দেওয়া হবে না কেন তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রোববার আদালত তা যথাযথ ঘোষণা করে জামিন দেন।
এর আগে গত ৩ আগস্ট একই হাইকোর্ট বেঞ্চ ভাঙচুর, হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা আরও দুটি মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে জামিন দিয়েছিলেন। আজকের আদেশের পর ওই দুই মামলাসহ মোট চারটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেন তিনি।
কেন এখনো মুক্তি মিলছে না
চিন্ময়ের আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জামিন পাওয়া মামলাগুলো থেকে মুক্তির পথ তৈরি হলেও অন্য মামলায় তিনি এখনও আটক থাকায় কারাগার থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
এর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আদেশ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত স্থগিত করেছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর এ স্থগিতাদেশ দেওয়া হয় এবং লিভ টু আপিলের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকে।
অন্যদিকে, আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় হাইকোর্ট ইতোমধ্যে চিন্ময়ের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন। ওই মামলার বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ শুরু হওয়ায় আদালত জামিন আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে। মামলাটির বিচার চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে।
যেভাবে শুরু হয় মামলা ও গ্রেপ্তার
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার বড় অধ্যায় শুরু হয় জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে।
২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন তৎকালীন চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান। ওই মামলায় ২৫ নভেম্বর ঢাকায় গ্রেপ্তার হন চিন্ময়। পরদিন তাকে চট্টগ্রামের আদালতে হাজির করা হলে জামিন আবেদন নাকচ হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে সংঘর্ষ ও আলিফ হত্যা
চিন্ময়ের জামিন নামঞ্জুরের পর ২৬ নভেম্বর ২০২৪ চট্টগ্রাম আদালত এলাকায় তার অনুসারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের মধ্যে আদালতের কাছাকাছি এলাকায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে মারধর ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর নিহত আইনজীবীর বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পর ওই মামলায়ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন আদালত।
এ ছাড়া ওই সময়ের ঘটনায় হত্যাচেষ্টা, হামলা, সরকারি কাজে বাধা, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে আরও কয়েকটি মামলা করা হয়। এসব মামলার কয়েকটিতেও চিন্ময়কে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
জামিনের ধারাবাহিকতায় নতুন মোড়
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোতে একে একে জামিনের আবেদন করা হয়।
এপ্রিল ২০২৬-এ চট্টগ্রামের একটি মামলায় নিম্ন আদালত থেকেও তিনি জামিন পেয়েছিলেন। তবে অন্যান্য মামলা থাকায় তখনও তার মুক্তি সম্ভব হয়নি।
এরপর আগস্টে হাইকোর্ট দুটি মামলায় জামিন দেন এবং রোববার আরও দুটি মামলায় জামিন মঞ্জুর হওয়ায় মোট চারটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেন তিনি। কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জামিন স্থগিত এবং আলিফ হত্যা মামলার বিচার চলমান থাকায় এই মুহূর্তে তার কারামুক্তির আইনি সুযোগ তৈরি হয়নি।
ফলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ক্ষেত্রে আজকের হাইকোর্টের আদেশ তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি সরাসরি কারামুক্তির আদেশ নয়। তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন ও স্থগিত থাকা মামলাগুলোর আইনি অবস্থার ওপরই এখন নির্ভর করছে তিনি কবে কারাগার থেকে বের হতে পারবেন।
অর্থাৎ চার মামলায় জামিন মিললেও বাকি মামলাগুলোর কারণে আপাতত কারাগারেই থাকতে হচ্ছে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে।
সিএক্স/রয়েল





