নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার ওয়্যারলেস এলাকায় পুলিশের অভিযানের পর ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার অভিযানের সময় সংঘর্ষ ও হামলার মধ্যে বগা তার বাসার একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান। ওই ঘটনায় খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিমসহ অন্তত ছয় পুলিশ সদস্য আহত এবং পুলিশের একটি সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
“পুলিশের অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় একটি অনলাইন পোর্টালের ভিডিওতে বগাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।” সেখানে তিনি পুলিশের অভিযানের বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
ফলে শুক্রবার ভোরের অভিযান থেকে বিকেলের সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন পুলিশের দাবি অনুযায়ী বগা যদি অভিযানের সময় গোপন পথ দিয়ে পালিয়ে থাকেন, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কীভাবে তিনি নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হলেন?
ভোরের অভিযান ও পুলিশের ওপর হামলা
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ওয়্যারলেস মোড় ও পাহাড়তলী এলাকায় বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়। পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় দায়ের করা মামলাসহ তার বিরুদ্ধে থাকা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশের দাবি, অভিযান শুরুর আগেই বগার অনুসারীরা সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, কাচের বোতল ও ককটেলসদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। এতে ওসি আবদুর রহিমসহ ছয় জন পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের সরকারি গাড়িটিও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছেন বগা’
অভিযানের পর পুলিশ বগার বাসায় গিয়ে একটি গোপন সুড়ঙ্গপথের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়। পুলিশের ধারণা, ওই পথ ব্যবহার করেই বগা অভিযানের সময় বাসা থেকে বের হয়ে যান।
এ কারণেই শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বগার ‘সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে যাওয়ার’ বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একাধিক সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে পুলিশের বর্ণনার এই অংশের বিপরীতে সংবাদ সম্মেলনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন বগা।
‘সুড়ঙ্গ নয়, রান্নার চুলা’
সংবাদ সম্মেলনে বগা পুলিশের দেখানো কথিত সুড়ঙ্গকে সুড়ঙ্গ হিসেবে মানতে অস্বীকার করেন। তার দাবি, সেটি কোনো পালানোর পথ নয়, বরং রান্নার চুলা বা রান্নার কাজে ব্যবহৃত স্থাপনা।
তার এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার নিরপেক্ষ পরিদর্শন, ছবি-ভিডিও এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। পুলিশের দাবি ও বগার বক্তব্য দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এ জায়গাতেই সরাসরি বিরোধ তৈরি হয়েছে।
পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও অস্বীকার
পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ করা হলেও বগা তা অস্বীকার করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তার দাবি, পুলিশের গাড়ি তার অনুসারীরা ভাঙচুর করেনি। বরং পুলিশ সদস্যরাই তাকে ফাঁসাতে নিজেদের গাড়ি নিজেরা ভাঙচুর করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, হামলাকারীদের ইটপাটকেল ও অন্যান্য বস্তুর আঘাতে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘৫৪ মামলার আসামি ছিলাম’
সংবাদ সম্মেলনে বগা নিজের রাজনৈতিক অতীত তুলে ধরে দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এসব মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে জুন মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বগা নিজেই দাবি করেছিলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা হয়েছিল। অর্থাৎ মামলার সংখ্যা নিয়ে তার নিজের বক্তব্যেও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন সংখ্যা এসেছে।
‘তারেক রহমানের সঙ্গে সাত মিনিট কথা হয়েছে’
সংবাদ সম্মেলনে বগা আরও দাবি করেন, তৎকালীন সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার সঙ্গে ফোনে প্রায় সাত মিনিট কথা বলেছেন।
তিনি ওই কথোপকথনের বিষয়টি তুলে ধরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দলের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলেন।
‘পুলিশ এখনো ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারের মতো আচরণ করে’
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র অভিযোগ তোলেন বগা।
তার অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও পুলিশের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি, পুলিশ এখনো ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডারদের মতো আচরণ করছে।
তিনি পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিচার ও তদন্তের দাবি জানান।
‘পুলিশের গুলিতে নারী ও পাপ্পু আহত’
ভোরের অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে ওয়্যারলেস এলাকার ৫ নম্বর লাইনের এক নারী এবং ‘পাপ্পু’ নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন বগা।
তার প্রশ্ন, পুলিশ কেন এবং কী কারণে গুলি চালিয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই দুই ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ দাবির সত্যতা যাচাই করতে আহত ব্যক্তিদের পরিচয়, চিকিৎসার নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
শিক্ষককে মারধরের অভিযোগও অস্বীকার
পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় বগাকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ ও একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে বগা ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, মিজানুর রহমানকে মারধরের ঘটনা সম্পর্কে তিনি জানেন না এবং তাকে ঠিকমতো চেনেনও না।
এ ঘটনায় অভিযোগকারী শিক্ষক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য এবং মামলার এজাহারই হবে অভিযোগের প্রাথমিক নথিভিত্তিক ভিত্তি।
‘আরিফুর রহমানকে চিনি না’
আরিফুর রহমান নামে একজনকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও বগা অস্বীকার করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
ওসির বিরুদ্ধে ৭ লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি করেন বগা নিজেই। তার দাবি, খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম তার বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়া বা মামলা সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে ৭ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন।
বগার ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই তিনি ওসিকে গালাগাল করেন।
তবে এই অর্থ দাবির অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের নথি, অডিও রেকর্ড, সাক্ষী বা লিখিত অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে কিনা তা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।
ওসিকে হুমকির অভিযোগ
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে বগার বিরুদ্ধে ওসি আবদুর রহিমকে মুঠোফোনে গালাগাল ও মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় খুলশী থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথা জানিয়েছেন ওসি।
পুলিশের দাবি, শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় মামলা হওয়ার পরই বগার পক্ষ থেকে ওসিকে ফোন করা হয়।
এ অভিযোগের বিপরীতে বগার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বীকার করেছেন যে ওসির সঙ্গে তার উত্তপ্ত কথাবার্তা হয়েছিল বলে তার বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়, তবে এর পেছনে ওসির কাছ থেকে অর্থ দাবির অভিযোগকে কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
দল থেকে বহিষ্কার
ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা একসময় চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ২০২৬ সালের ৮ জুন দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান ওই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন বলে দলীয় দপ্তরাদেশে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের বগার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
শুক্রবার ভোরে পুলিশের অভিযান, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অন্তত ছয় পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার দাবি, সরকারি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বাসার ভেতরে গোপন সুড়ঙ্গ পাওয়ার কথা জানানো এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বগার প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়া ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
একদিকে পুলিশের বক্তব্য অভিযানের সময় বগা গোপন সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে যান। অন্যদিকে বগার বক্তব্য সেটি কোনো সুড়ঙ্গ নয়, রান্নার চুলা, পুলিশের গাড়িও তার লোকজন ভাঙেনি। একই সঙ্গে পুলিশের গুলিতে সাধারণ মানুষ আহত, ওসির অর্থ দাবির অভিযোগসহ একাধিক পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
এখন এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ও মোবাইল ভিডিও, আহতদের চিকিৎসা নথি, পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের রেকর্ড, মামলার এজাহার ও আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য।
কারণ অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই ঘটনায় আপাতত নিশ্চিত বিষয় হলো পুলিশ বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়েছে, পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন এবং বগা ওই অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। বাকি অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন তদন্তের বিষয়।
সিএক্স/রয়েল






