চট্টলা এক্সপ্রেস | বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে উঠে আসা, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আজ ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। তবে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর প্রয়াণের পর এবারের জন্মদিন এসেছে তাঁকে স্মরণ করার একটি বিশেষ উপলক্ষ হিসেবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন অর্জন ও সাফল্যের জন্য স্মরণীয়, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক ও সমালোচনাও। এসবের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সময়: এক পরিবারের কঠিন অধ্যায়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি।মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে, যুদ্ধের সময় খালেদা জিয়ার পারিবারিক জীবনও ছিল অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতায় ঘেরা।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন সময়ে খালেদা জিয়া ও তাঁর সন্তানরা পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তাঁরা স্বাধীনভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি।
দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলে তিনি মুক্তি পান।
ফলে মুক্তিযুদ্ধ তাঁর পরিবারের জন্য শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় ছিল না, এটি ছিল ব্যক্তিগত জীবনেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক কঠিন সময়।
গৃহবধূ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল প্রচলিত অর্থে রাজনীতিক হিসেবে নয়। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
স্বামীর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পারিবারিক পথচলার পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি কঠিন সংকটে পড়ে। সেই সময় রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় না থাকা খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন।
১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির সহসভাপতি এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন।
১৯৮০-এর দশকে তিনি সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিকবার আটক ও অন্তরীণ করা হলেও তিনি রাজপথের কর্মসূচি থেকে সরে আসেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন নেতৃত্ব
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে খালেদা জিয়া দ্রুতই বিএনপির প্রধান নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮০-এর দশকে তাঁকে একাধিকবার আটক ও গৃহবন্দিত্বের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এই সময় থেকেই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধানটি ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের সময় সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস হয়।
তাঁর প্রথম সরকারের সময়ে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি, দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ এবং ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারীশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে এসব উদ্যোগ পরবর্তীতে দেশের সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবকাঠামো, অর্থনীতি ও যোগাযোগ
খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সময়ে শিল্প, বেসরকারি বিনিয়োগ, টেলিযোগাযোগ ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নীতিগত পরিবর্তন আসে।
তাঁর সরকারের সময়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের যাত্রা শুরু হয় এবং আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন সম্প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়। সার্কের আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতেও তাঁর সরকার ভূমিকা রাখে। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং খালেদা জিয়া সার্কের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পেলে ১০ অক্টোবর তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকার দেশ পরিচালনা করে।
এই সময়ে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্প ও টেলিযোগাযোগ খাতে সম্প্রসারণ ঘটে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ভাতা এবং বিভিন্ন সুবিধাভোগীর পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশ রক্ষায় পুরোনো যানবাহন ও দূষণকারী দুই-স্ট্রোক বেবি-ট্যাক্সি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও তাঁর সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল।
সাফল্যের পাশাপাশি ছিল বিতর্কও
একজন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার পথচলা কেবল সাফল্যে পূর্ণ ছিল না। তাঁর সরকারের বিভিন্ন নীতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, ২০০১-২০০৬ মেয়াদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির মামলাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। তবে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অবস্থান ছিল পরস্পরবিরোধী, বিএনপি ও খালেদা জিয়ার সমর্থকেরা তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
তাই ইতিহাসের বিচারে খালেদা জিয়াকে মূল্যায়ন করতে গেলে যেমন তাঁর রাজনৈতিক অর্জন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা বিবেচনায় নিতে হয়, তেমনি তাঁর সরকারের সময়কার বিতর্কগুলোকেও ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একজন নারী নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি হলো তিনি এমন একটি সময়ে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে এসেছিলেন, যখন রাজনীতি ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান।
স্বামীর মৃত্যুর পর শোক ও ব্যক্তিগত সংকট পেরিয়ে তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নেত্রী বিভিন্ন ভূমিকায় তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মতপার্থক্য নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক থাকলেও এটিও সত্য যে, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাজনীতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ অধ্যায় তৈরি করেছে।
ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়া
একজন গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক দলের প্রধান, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা ছিল দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল।
শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, যোগাযোগ ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের নেওয়া উদ্যোগ যেমন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারের কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন বিতর্কও একই ইতিহাসের অংশ।
একজন রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়ন কেবল প্রশংসা কিংবা সমালোচনার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। সময়ের প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্জন, সীমাবদ্ধতা, সিদ্ধান্ত ও তার প্রভাব সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ইতিহাস একজন নেতাকে মূল্যায়ন করে।
বেগম খালেদা জিয়া এখন প্রয়াত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং তাঁর সময়ের নানা ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
জন্মবার্ষিকীতে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি
বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নিচ্ছেন।
এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নানা আয়োজনে বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অর্জন, নেতৃত্ব, আন্দোলন-সংগ্রাম, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অধ্যায় তৈরি করেছেন, তাঁর জন্মবার্ষিকী সেই রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
সিএক্স/রয়েল






