বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট কাটাতে লাগতে পারে দুই বছর: অর্থমন্ত্রী

চট্টলা এক্সপ্রেস ডেক্স:

দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দ্রুত পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে, ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সংকটের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।

রোববার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নীতি সংস্কার কার্যকর করার লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন।

জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে সময় লাগবে

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে তৈরি সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তিনি জানান, দেশে দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস সংরক্ষণে নতুন পরিকল্পনা

গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পাশাপাশি স্থলভাগে গ্যাস সংরক্ষণ সুবিধা তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান আমির খসরু।

তিনি বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেই প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকটের টেকসই সমাধান পেতে সময় প্রয়োজন হবে।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রকাশের কথাও জানান তিনি। সেখানে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস এবং কোন খাতে কী ধরনের জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এসব বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।

উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও সঞ্চালনে সমস্যা
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা মোটামুটি পর্যাপ্ত থাকলেও সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি জানান, সরকার বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্রণ নির্ধারণে কাজ করছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সব উৎসকেই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

ব্যাংক খাতে বড় মূলধন ঘাটতি

অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতের সংকট নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর পরিমাণ এত বেশি যে শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে এ ঘাটতি পূরণ করা কঠিন।

খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতিকে শুধু ব্যাংকনির্ভর না রেখে পুঁজিবাজারসহ অন্যান্য অর্থায়নের পথও শক্তিশালী করতে হবে। এতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।

করনীতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব

রাজস্ব খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে করনীতি প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান আমির খসরু। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দুটি পৃথক কাঠামোয় ভাগ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তাঁর ভাষ্য, করনীতি নির্ধারণের দায়িত্ব একটি বিশেষজ্ঞভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে কাজ করবে।

কর ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এর ফলে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল, কর ফেরতসহ বিভিন্ন সেবা আরও দ্রুত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে কর আরোপের বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে একটি তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসার জটিলতা কমাতে টাস্কফোর্স

ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কমাতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, টাস্কফোর্সটি তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।

কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ যাতে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

প্রয়োজনে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিদ্যমান কিছু আইন সংশোধন করা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংস্কার

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এসব বাধা কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।

নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হলেও সরকার এ বিষয়ে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাবে বলে জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেগুলোর সমাধানে অংশীদার হতে চায় অ্যামচেম। বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

সিএক্স/রয়েল