চট্টগ্রামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য মহাশোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার সকালে নগরীর আন্দরকিল্লা মোড় থেকে শুরু হওয়া এ শোভাযাত্রায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। আয়োজন থেকে উঠে এসেছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, সম-অধিকার ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। মানুষের মূল্যায়ন ধর্মের পরিচয়ে নয়, বরং জ্ঞান, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কোনো মানুষ যেন বৈষম্য বা বিভাজনের শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শোভাযাত্রার উদ্বোধক বাঁশখালীর ঋষিধাম ও তুলসীধামের মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ পুরী মহারাজ বলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবজাতির জন্য মানবপ্রেমের চিরন্তন শিক্ষা রেখে গেছেন। নিয়মিত ধর্মচর্চা ও নৈতিক জীবনযাপনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। সব ধর্মেই সাম্য, শান্তি ও মানবতার শিক্ষা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শোভাযাত্রায় নানা সাজে কৃষ্ণলীলা
আন্দরকিল্লা মোড় থেকে শুরু হওয়া মহাশোভাযাত্রাটি নগরীর লালদিঘীর পাড়, কোতোয়ালি মোড়, নিউ মার্কেট, রাইফেল ক্লাব, বোস ব্রাদার্স, বৌদ্ধ মন্দির ও মোমিন রোড হয়ে জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
শ্রীকৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও লীলাকে কেন্দ্র করে ভক্তরা নানা সাজে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। ঢাক-ঢোল, বাঁশির সুর ও নামসংকীর্তনে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো।
শোভাযাত্রায় ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারও দেখা যায়। এসবের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ বন্ধ, সংবিধান অনুযায়ী সম-অধিকার নিশ্চিত করা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি উঠে আসে।
‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ কৃষ্ণের শিক্ষার বার্তা
জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার বলেন, ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষাকে সামনে রেখে তারা এগিয়ে যেতে চান। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের পার্থক্য ভুলে সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিষদের কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ বলেন, শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে তারা অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বাংলাদেশের বার্তা দিতে চান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারেন এবং চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নাগরিক হিসেবে সমান সুযোগ পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া ‘সনাতনী অধিকার আন্দোলন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি’র নেতাকর্মীদের বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে ধর্মীয় বিভাজন বন্ধ, সংবিধান অনুযায়ী সম-অধিকার, দেশান্তরের কারণ অনুসন্ধান এবং সংগঠনটির ঘোষিত ‘৮ দফা’ বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানার ও ফেস্টুনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, ধর্ষণ, মন্দির ভাঙচুর, দখল, অগ্নিসংযোগ ও সাম্প্রদায়িক উসকানির ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানানো হয়। এছাড়াও শোভাযাত্রা র্যালিতে ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে অংশ নেন সচেতন সনাতনী নাগরিক সমাজ কমিটির নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন।
উপস্থিত ছিলেন না ঘোষিত কয়েকজন অতিথি
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রধান অতিথি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন উদ্বোধক এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।
এ বিষয়ে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আর কে দাশ রুপু বলেন, ওই অতিথিরা বিকেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
বিকেলে ধর্ম সম্মেলন
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে নগরীর জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে ধর্ম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
আয়োজকদের কর্মসূচি অনুযায়ী, ৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে মহাশোভাযাত্রা, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পূজা ও ভোগরাগ, ধর্মমহাসম্মেলন, সাধু-বৈষ্ণব সম্মেলন, ষোড়শপ্রহরব্যাপী মহানামযজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা এবং মাতৃ সম্মেলন।
জন্মাষ্টমীর উৎসবকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাম্য, মানবতা, সম্প্রীতি ও নাগরিক অধিকারের বার্তাও এবারের চট্টগ্রামের মহাশোভাযাত্রায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
সিএক্স/রয়েল





