লাভ কম, আধুনিকায়নে জোর: পিপিপি মডেলে যাচ্ছে পর্যটন কর্পোরেশনের ৫৩ হোটেল-রেস্তোরাঁ

চট্টলা এক্সপ্রেস ডেস্ক:  দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত আর্থিক সাফল্য না পাওয়ায় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের অধীন পরিচালিত ৫৩টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, বার, পিকনিক স্পট ও পর্যটন তথ্যকেন্দ্রকে ধাপে ধাপে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি) মডেলের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, পর্যটন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা গড়ে তোলা।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত অনেক পর্যটন স্থাপনা প্রত্যাশিত আয় দিতে পারছে না। ফলে কেবল সরকারি অর্থে এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শেষে কর-পূর্ববর্তী পুঞ্জীভূত পরিচালন উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা বিশাল সম্পদের তুলনায় খুবই সীমিত।

প্রথম বড় প্রকল্প কক্সবাজারের হোটেল শৈবাল

পিপিপি উদ্যোগের প্রথম বড় প্রকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে কক্সবাজারের হোটেল শৈবালকে। প্রায় ১৩২ একর সরকারি জমির ওপর আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।

প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে ওয়াটার ভিলা, লাক্সারি কটেজ, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, আধুনিক ফুড কোর্ট, গেমিং জোন, শিশু পার্ক, এমিউজমেন্ট পার্ক, থ্রিডি সিনেপ্লেক্স, শপিং আর্কেড এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্য তুলে ধরার বিশেষ প্রদর্শনী এলাকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য কী?

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, সরকারের উদ্দেশ্য শুধু লোকসান কমানো নয়, বরং বেসরকারি খাতের দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে পর্যটন সুবিধাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। একই সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে সরকারের আয়ও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করবে

হোটেল শৈবাল প্রকল্পের মাস্টার প্ল্যান, সম্ভাব্যতা যাচাই, বিনিয়োগ কাঠামো ও দরপত্র নথি প্রস্তুতের জন্য যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও ভারতের সাতটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছে।

নির্বাচিত পরামর্শক প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা, আর্থিক বিশ্লেষণ, ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ মডেল তৈরি করবে। এরপর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকল্পটি উন্মুক্ত করা হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব

পর্যটন কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উন্নয়ন কার্যক্রমের সময় হোটেল শৈবালের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্বাদু পানির জলাশয় সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কোনো পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা হবে না।পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারে সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা

হোটেল শৈবাল প্রকল্পটি কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাবে রূপান্তরের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এ পরিকল্পনায় পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল প্রবাল, হোটেল লাবণীসহ অন্যান্য সরকারি সম্পদও অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ইতোমধ্যে কয়েকজন বিদেশি বিনিয়োগকারী সৈকতভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

কেন এ নীতিগত পরিবর্তন?

করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠলেও পর্যটন কর্পোরেশনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত মুনাফায় ফিরতে পারেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-পূর্ববর্তী পরিচালন উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ২৪ লাখ ৪ হাজার টাকা। এর আগের দুই অর্থবছরেও উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত।

অন্যদিকে মহামারির সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ১৯ কোটি ৬১ লাখ টাকার কর-পূর্ববর্তী পরিচালন লোকসান গুনতে হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে।

সরকারের আশা, পিপিপি মডেলে পরিচালনার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, পর্যটকদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত হবে, সরকারি ব্যয় কমবে এবং দেশের পর্যটন খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই ভিত্তি পাবে।

বিশেষজ্ঞদের মত: অবকাঠামোর পাশাপাশি বিশ্বমানের সেবা ও পার্বত্য পর্যটন উন্নয়নেও জোর

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল লোকসান কমানো বা আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রেস্তোরাঁ নির্মাণ করলেই দেশের পর্যটন শিল্প কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করবে না। টেকসই পর্যটন গড়ে তুলতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সেবা, দক্ষ জনবল, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে ভ্রমণের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

তাদের মতে, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আস্থা অর্জনে হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সহজ তথ্যপ্রাপ্তি, ডিজিটাল সেবা, মানসম্মত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিশ্বমানের আতিথেয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।পর্যটকদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাই একটি দেশের পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রচার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, কক্সবাজারকে ঘিরে যে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, একই ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগ চট্টগ্রামের পার্বত্য তিন জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাহাড়, হ্রদ, ঝরনা, বনাঞ্চল, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।

তাদের অভিমত, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে সমন্বিতভাবে আধুনিক পর্যটন অঞ্চলে গড়ে তুলতে পারলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে একটি আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।

 

সিএক্স/রয়েল