নিজস্ব প্রতিবেদক । চট্টলা এক্সপ্রেস
দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণের পাশাপাশি ছোট ঋণেও খেলাপির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে এই শ্রেণির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ২১ লাখ ৬৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২৪ লাখ নতুন গ্রাহক খেলাপির তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
ছোট ঋণে কেন বাড়ছে খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় ধীরগতি, কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পারিবারিক ঋণের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। এর ফলে ছোট ঋণের গুণগত মানও দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপের কারণে চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধিও ঋণ পরিশোধে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খেলাপি ঋণের সামগ্রিক চিত্র
চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ।
এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি হলেও গ্রাহকের সংখ্যার দিক থেকে বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এই শ্রেণির ঋণের প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ খেলাপি। একই সময়ে বড় ঋণের খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৮ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
কোন খাতে খেলাপি বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৪ শতাংশ। শিল্প খাতে এই হার ৩২ শতাংশ এবং সিএমএসএমই খাতে ৩৪ শতাংশ।
সিএমএসএমই খাতের মধ্যে কুটির শিল্পে খেলাপির হার সর্বোচ্চ, প্রায় ৫৩ শতাংশ। মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও খেলাপির হার উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া নির্মাণ খাতে খেলাপির হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভোক্তা ঋণে খেলাপির হার ৭ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর উদ্যোগ
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কমাতে তদারকি বাড়িয়েছে। কৃষি ও এসএমই খাতের ঋণ আদায়ে শাখা পর্যায়ে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিমালার আওতায় কিছু ঋণ নিয়মিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ছোট ঋণে খেলাপির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সতর্কসংকেত। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন, কৃষি খাতে সহায়তা এবং কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় ঋণের খেলাপির পাশাপাশি ছোট ঋণের খেলাপিও যদি একইভাবে বাড়তে থাকে, তবে তা দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সিএক্স/রয়েল






