৪৪ স্কুলের ফলে শীর্ষ তিনে চিটাগাং আইডিয়াল, প্রাণহরি ও আবদুর রহমান, সবচেয়ে কম পাসের হারে শেষ তিনে শাহ আমির, বাথুয়া ও হাইদগাঁও
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের পটিয়ায় এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। উপজেলার ৪৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সামগ্রিক পাসের হার ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫ জনই অকৃতকার্য হয়েছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছরে কমেছে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পয়েন্ট।
জিপিএ-৫-এর সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত বছর ৪১০ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছে ২০৯ জন কমেছে ২০১টি।
তবে ফলাফলের পুরো চিত্র হতাশার নয়। পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে চিটাগাং আইডিয়াল হাই স্কুল, দ্বিতীয় গৈড়লা খরনখাইন প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয় এবং তৃতীয় আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হারে রয়েছে শাহ আমির, বাথুয়া ও হাইদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়।
শীর্ষে চিটাগাং আইডিয়াল
চিটাগাং আইডিয়াল হাই স্কুলের ১০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৬ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৩ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন।
প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬২ জনের মধ্যে ৫৪ জন পাস করেছে। পাসের হার ৮৭ দশমিক ১০ শতাংশ।
আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৪৮ জনের মধ্যে ২০৪ জন পাস করেছে। পাসের হার ৮২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫-এর দিক থেকে বিদ্যালয়টিই উপজেলায় সেরা ৫৫ জন পেয়েছে।
ফলের এত পতন কেন?
একই পরীক্ষায় একটি বিদ্যালয়ে ৯৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করলেও অন্য প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার মান ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, নিয়মিত মূল্যায়নের অভাব, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা না পাওয়া, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাডেমিক যোগাযোগ এসব বিষয় ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালে ভালো ফল করা আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিশেষ ক্লাস ও নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবারও বিদ্যালয়টি জিপিএ-৫-এর দিক থেকে সেরা হয়েছে। এতে নিয়মিত মূল্যায়ন ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার গুরুত্ব সামনে আসে।
তলানিতে শাহ আমির, বাথুয়া ও হাইদগাঁও
শাহ আমির উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬৩ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৩ জন, পাসের হার ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।
বাথুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৮ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৫ জন, হার ২৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
হাইদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯১ জনের মধ্যে পাস করেছে ৫৩ জন, হার ২৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তিন বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই এবার জিপিএ-৫ পায়নি।
হাইদগাঁওয়ে ২০২৫ সালেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। তাই প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলের ধারাবাহিকতা ও বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বোর্ডের ফলেও পিছিয়ে নেই মেয়েরা
পটিয়ার ফলাফলের পাশাপাশি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক ফলেও একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে। বোর্ডে ছাত্রীদের পাসের হার ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ, ছাত্রদের ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রীদের মধ্যে ৫ হাজার ২৭৫ জন এবং ছাত্রদের মধ্যে ৪ হাজার ১২৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার সামগ্রিক পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, গত বছর ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন, গত বছর ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন।
দাখিল ও কারিগরিতেও পতন
পটিয়ার ২৩টি মাদ্রাসা থেকে এবার দাখিলে ৮৬৫ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ৬২৯ জন। পাসের হার ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭৯ দশমিক ০৩ শতাংশ।
দাখিলে সেরা মেহেরআটি হযরত নুরুদ্দীন শাহ দাখিল মাদ্রাসা ৩৫ জনের সবাই পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন।
কারিগরি বোর্ডের এসএসসি ভোকেশনালে ৩৫৩ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ৪১ শতাংশ, গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
শিক্ষাবিদদের পরামর্শ
পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) দিপন কান্তি দে বলেন, শিখনঘাটতি, প্রস্তুতির দুর্বলতা ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত একাডেমিক সহায়তার অভাব ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
ভবিষ্যতে বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ, রেমিডিয়াল ক্লাস, নিয়মিত মূল্যায়ন ও একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী মনে করেন, মানসম্মত শিক্ষক, যোগ্য প্রধান শিক্ষক এবং কার্যকর ও প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
পটিয়ার ফলাফল শুধু ‘পাস-ফেল’-এর হিসাব নয়, একই উপজেলার বিদ্যালয়গুলোর ফলাফলে যে বিশাল ব্যবধান দেখা গেছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোথাও ৯৩ শতাংশ পাস, কোথাও ২০ শতাংশের নিচে এই পার্থক্যের কারণ খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এ জন্য ৪৪টি বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক ফল, শিখনঘাটতি, শিক্ষকসংকট ও নিয়মিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সিএক্স/রয়েল






