গুলির শব্দ, অপহরণের আতঙ্কে ঘরছাড়া টেকনাফের মানুষ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত জনপ্রতিনিধিরাও

গুলির শব্দ, অপহরণের আতঙ্কে ঘরছাড়া টেকনাফের মানুষ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত জনপ্রতিনিধিরাও

কচ্ছপিয়া-নোয়াখালী পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় টানা গোলাগুলি ও অপহরণের ঘটনায় অর্ধশতাধিক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে,

গুলির শব্দ, অপহরণের আতঙ্কে ঘরছাড়া টেকনাফের মানুষ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত জনপ্রতিনিধিরাও
টেকনাফ কচ্ছপিয়ার পাহাড়ি এলাকা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আশ্বাস।

চট্টলা এক্সপ্রেস ডেস্ক:

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া-নোয়াখালী পাহাড়ঘেঁষা জনপদে কয়েক মাস ধরে চলমান গোলাগুলি ও অপহরণের ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পরিস্থিতির কারণে অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই আবার রাত হলে নিজ বাড়িতে না থেকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর থেকেই পাহাড়ি এলাকা থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। একের পর এক অপহরণের ঘটনায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ পুরো এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্য নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক অপহরণের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

গত ১৭ জুলাই বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নয়াপাড়া এলাকায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে অস্ত্রধারীরা অপহরণ করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরদিন পরিবারের পক্ষ থেকে মুক্তিপণ দেওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে আনার কথা জানা যায়।

এর আগে ২৮ জুন নোয়াখালী জুম্মাপাড়া এলাকা থেকে এক পল্লী চিকিৎসককে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এখনও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। একই এলাকায় এর আগেও আরও কয়েকজন অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

‘এভাবে চলতে থাকলে এলাকা জনশূন্য হয়ে যাবে’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, টানা অপহরণ ও গোলাগুলির ঘটনায় মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা চরমে পৌঁছেছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, তার ওয়ার্ডের ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আরও অনেক পরিবার চলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তার ভাষায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তিন বছরে অপহরণের অভিযোগ ৩২০ জনের

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গত এক বছরে ১৫টি ঘটনায় প্রায় ১৫৫ জনকে অপহরণের তথ্য পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুক্তিপণের বিনিময়ে ভুক্তভোগীরা ফিরে এসেছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

এ সময়ের মধ্যে অপহরণের পাশাপাশি গুলিবর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যা এলাকায় আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার সরিয়ে নিচ্ছেন বাসিন্দারা

নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকের জানান, তাদের আশপাশের একাধিক পরিবার ইতোমধ্যে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্ত্রী-সন্তানদেরও তিনি টেকনাফ পৌর এলাকায় ভাড়া বাসায় রেখেছেন। তিনি দিনে বাড়িতে থাকলেও রাতে নিরাপত্তার কারণে অন্যত্র অবস্থান করেন।

একই এলাকার ব্যবসায়ী মো. সাব্বির বলেন, বর্তমানে মানুষের মধ্যে এমন আতঙ্ক বিরাজ করছে যে, নিজের বাড়িতেও নিরাপদ বোধ করছেন না তারা।

যা বলছেন জনপ্রতিনিধিরা

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে সংঘটিত অপহরণ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধ দমনে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অপহরণপ্রবণ এলাকায় পুলিশের চৌকি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, অপহরণ ও গোলাগুলির ঘটনায় মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দ্রুত কার্যকর অভিযান না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসনের আশ্বাস

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে বাহারছড়া এলাকায় পুলিশের মোবাইল টহল জোরদার করা হয়েছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানান, বাহারছড়া এলাকায় অপহরণ ও সশস্ত্র তৎপরতা দমনে বড় পরিসরে যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সেখানে স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

সিএক্স/রয়েল