জন্মাষ্টমীতে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা তারেক রহমানের, ‘সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, সবাই বাংলাদেশি’

চট্টলা ডেক্স:

দেশে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি, বিদ্বেষ ও গুজব যাতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ধর্মীয় গুরু, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পুরোহিত ও সেবাইতরা অংশ নেন।

‘সাম্প্রদায়িক উসকানি ও গুজবের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কোনো রকমের সাম্প্রদায়িক উসকানি কিংবা বিদ্বেষ যেন সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

তিনি বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য কেউ কেউ বিভিন্নভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আশ্রয় নিয়ে মানুষকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টাও করা হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিহত করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

‘সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, সবাই বাংলাদেশি’

তারেক রহমান বলেন, একটি রাষ্ট্র ও সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও পরিচয়ের মানুষের সম্মিলনই বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য। সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু পরিচয়কে মুখ্য না করে সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা সফরে গেলে আজকের অনুষ্ঠানে যারা নিজেদের ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে বিবেচনা করছেন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে কথিত সংখ্যালঘু হয়ে যান। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক হিসেবে মানুষের অভিন্ন পরিচয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র ও সমাজে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা অন্য কোনো পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য তৈরির কারণ না হয় এ উপলব্ধি থেকে সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে এখন দেশ পুনর্গঠনের পালা।

সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী

নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। অন্যদিকে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও সংলাপের মাধ্যমেই সবার প্রত্যাশিত কল্যাণরাষ্ট্র বা ‘কল্যাণ বাংলাদেশ’ গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘এই রাষ্ট্র ও সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে’ তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ত্যাগী সনাতনী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের আহ্বান

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা বিএনপিপন্থী সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরে যারা রাজনৈতিকভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সন্তোষ শর্মা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অর্পিত সম্পত্তির বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন এবং এ বিষয়ে সনাতন সম্প্রদায়ের জন্য সরকারের কাছ থেকে আশ্বাস প্রত্যাশা করেন।

‘বিএনপি করার কারণে অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাকর্মীদের অনেকে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। শুধু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অনেককে প্রাপ্য পদোন্নতি থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

রিজভী বলেন, অতীতে ভয় ও আতঙ্কের কারণে মানুষ স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারত না। বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেও সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এজন্য গুম হয়ে যাওয়ার ভয় নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ অর্পিত সম্পত্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, অতীতে এ বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ অনেকে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বিপুল পরিমাণ অর্পিত সম্পত্তির মধ্যে আড়াই একর শ্মশানের জমির সন্ধান পাওয়া গেলেও বাকি সম্পত্তির বড় অংশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে ছিল।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী-উপদেষ্টাসহ বিশিষ্টজনেরা

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি আসন্ন দুর্গাপূজারও আগাম শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সচিবালয়ে তাঁর দপ্তর থেকে পায়ে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে যান।

জন্মাষ্টমীর এই আয়োজন ধর্মীয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি নাগরিকের সমঅধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সামনে এনেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যেমন ঐক্য ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি সনাতন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজনৈতিকভাবে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, অর্পিত সম্পত্তি এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রত্যাশার বিষয়।

সিএক্স/রয়েল