পাসের হার ৫৯.৪৮%; এক বিষয়ে ফেল ২৮ হাজার ৭৭১ জন, শূন্য পাসের বিদ্যালয় ৩৮টি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে। চলতি বছর এ বোর্ডে পাসের হার নেমে দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বোর্ডের ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের ফলাফল তুলনা করে দেখা যায়, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৮ দশমিক ০৫ শতাংশ পয়েন্ট। আর গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ পয়েন্ট।
পাঁচ বছরে ধারাবাহিক পতন
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। পরের বছর ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশে।
২০২৪ সালে পাসের হার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৫ সালে আবার বড় পতন ঘটে। ওই বছর পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ।
সর্বশেষ ২০২৬ সালে এসে তা আরও কমে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে ঠেকেছে।
অর্থাৎ ধারাবাহিক কয়েক বছরের নিম্নমুখী প্রবণতার পর এবারই সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা গেল চট্টগ্রাম বোর্ডের ফলাফলে।
পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, পাস ৭৭ হাজার
এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত হয় ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন।
উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। বিপরীতে অকৃতকার্য হয়েছে ৫২ হাজার ৭৫৬ জন।
ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে, তবে দুজনেরই ফল খারাপ
পাসের হারে এবারও ছাত্রীদের অবস্থান কিছুটা ভালো। চলতি বছর ছাত্রীদের পাসের হার ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
তবে গত কয়েক বছরের হিসাব দেখলে দেখা যায়, শুধু ছেলেদের নয়, ছাত্রীদের ফলাফলও উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়েছে।
ছাত্রীদের পাসের হার ২০২২ সালে ছিল ৮৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা ৭৮ দশমিক ৭২, ২০২৪ সালে ৮৩ দশমিক ২১ এবং ২০২৫ সালে ৭২ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমে আসে। এবার সেটি আরও কমে ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ হয়েছে।
ছাত্রদের ক্ষেত্রে ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৭৭ দশমিক ৭৫, ২০২৪ সালে ৮২ দশমিক ২৯ এবং ২০২৫ সালে ৭১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এবার তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশে।
এক বিষয়ে ফেল ২৮ হাজারের বেশি
চট্টগ্রাম বোর্ডের এবারের ফলাফলের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে এক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
মোট ২৮ হাজার ৭৭১ জন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে ফেল করেছে। তাদের অনুপাতে এক বিষয়ে অকৃতকার্যের হার ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ।
গত বছর এই হার ছিল ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেই একটি বিষয়ে অকৃতকার্যের হার বেশ বেড়েছে।
৩৮ বিদ্যালয়ে একজনও পাস করেনি
ফলাফলের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো শূন্য পাসের বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি।
২০২৬ সালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ৩৮টি বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
অথচ ২০২৫ সালে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র একটি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল শূন্য।
অন্যদিকে এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে মাত্র ২১টি বিদ্যালয়ে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৩টি। ২০২৪ সালে ৪৬টি, ২০২৩ সালে ৪৫টি এবং ২০২২ সালে ৭১টি বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল।
জিপিএ-৫-এও বড় পতন
পাসের হারের পাশাপাশি এবার জিপিএ-৫ অর্জনেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
২০২৬ সালে চট্টগ্রাম বোর্ড থেকে ৯ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। এর আগে ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৮২৩, ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৫০ এবং ২০২২ সালে ১৮ হাজার ৬৬৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল।
অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
শুধু পাসের হার নয়, একাধিক সূচকেই অবনতি
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পাঁচ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এবারের ফলাফলে একসঙ্গে কয়েকটি নেতিবাচক চিত্র উঠে আসে।
পাসের হার সর্বনিম্ন, জিপিএ-৫ কমেছে, শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে এবং শূন্য পাসের বিদ্যালয় বেড়েছে। একই সঙ্গে একটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর হারও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের জন্য গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে কেন ধারাবাহিকভাবে কমছে ফলাফল এবং কোন জায়গাগুলোতে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএক্স/রয়েল





