নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম ও নজিরবিহীন অপব্যবহার, সরকারি চাকরি বিধিমালার তোয়াক্কা না করে সুদের শর্তে শত কোটি টাকার অনৈতিক আর্থিক চুক্তিনামা সম্পাদন এবং সরকারি পদের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার অনৈতিক লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভান্ডার বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) সালাহউদ্দিন আহমেদ। প্রমোশন নিশ্চিত করা এবং পছন্দের লোভনীয় পদে পদায়ন পেতে একটি শক্তিশালী লবিং ও দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে একের পর এক উন্মোচিত হওয়া স্বহস্তে লিখিত ও স্বাক্ষরিত সম্মতিপত্র, শত টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক এবং নিকটাত্মীয়দের জামিনদার (গ্যারান্টার) রাখার চাঞ্চল্যকর নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে আসীন হতে তিনি শত কোটি টাকার এক ভয়াবহ আর্থিক খেলায় মেতেছিলেন। বন্দরের পদ দখলের পর তার দৃষ্টি পড়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদের দিকে। এমনকি সাম্প্রতিকতম অনুসন্ধানে ৭০ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধের অবিশ্বাস্য দলিলে সই করে নিজ স্ত্রী ও বোনকে জামিনদার বানানোর নজিরবিহীন প্রমাণ সময়ের কন্ঠস্বরের প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য ও অনুসন্ধানী নথি অনুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমেদ বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের একজন সদস্য (আইডি নম্বর: ১৬৫২১)। পিতা জারজিস আলী এবং মাতা বেগম শামসুন্নাহার। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মতিহার থানাধীন কাজলা-৬২০২ এলাকার তালাইমারী পূর্বাংশের এই স্থায়ী বাসিন্দার জন্ম তারিখ ৭ জানুয়ারি ১৯৮২ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৩২৫১৩***৫০। গত ১২ জুলাই ২০২৫ থেকে ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকাকালেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালকের চেয়ার বাগিয়ে নেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী নকশা তৈরি করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক একটি সুসংগঠিত দালালচক্রের মাধ্যমে তিনি নিজ হাতে সই করে এক অজ্ঞাত ব্যবসায়ীর কাছে একটি বিস্ফোরক সম্মতিপত্র হস্তান্তর করেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদের নিজ হাতে স্বাক্ষরিত সম্মতিপত্রের লেখা ছিল হুবহু এ রকম, “আমি এই মর্মে সম্মতি প্রকাশ করিতেছি যে, আমার একটি ব্যক্তিগত জরুরি প্রয়োজনে কিছু টাকার প্রয়োজন হওয়ায় নিম্নোক্ত শর্ত ও রেশিও মানিয়া সুস্থ মস্তিষ্কে, কাহারও বিনা প্ররোচনায়, নিজের সই-স্বাক্ষরে এই দলিল সম্পাদন করলাম। প্রিন্সিপাল এমাউন্ট ৩০ (ত্রিশ) কোটি টাকা × ২ + ৩০% সার্ভিস চার্জ = ৯ কোটি টাকা × ২ = ৬৯.০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, উক্ত ৩০ কোটি টাকার পরিবর্তে মোট ৬৯ কোটি টাকা আমি ১৮ (আঠারো) মাসের মধ্যে পরিশোধ করিব।”
এই অকল্পনীয় সুদি চুক্তির ওপর ভিত্তি করে সালাহউদ্দিন আহমেদ উক্ত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নগদ ৩০ কোটি টাকা গ্রহণ করেন। যার সিংহভাগ অর্থ তিনি ব্যবহার করেছিলেন মন্ত্রণালয় পর্যায়ে তার কাঙ্ক্ষিত পদায়নের তদবিরের কাজে। লবিং সফল হলে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয় এবং ২২ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে অবমুক্ত হয়ে ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার বিভাগে ‘কন্ট্রোলার অব স্টোরস’ (পরিচালক) পদে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে চট্টগ্রাম বন্দরের কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা ও ভান্ডার ব্যবস্থাপনায় নানাবিধ অনৈতিক ও বেআইনি সুবিধা দেওয়ার তথ্য মিলেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক পদ দখলের পর সালাহউদ্দিন আহমেদের পরবর্তী লক্ষ্য হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ। অনুসন্ধানী নথিপত্র বলছে, সরকারের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদটি বাগাতে তিনি ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে দ্বিতীয় একটি চুক্তি ও সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
উক্ত পদ বাগাতে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৪৫ কোটি টাকা সংগৃহীত হয়। অর্থ বণ্টনের শর্ত নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ থাকায় তৎকালীন সময়ে অর্থ হস্তান্তর না হলেও গত কোরবানির ঈদের পরপরই তা গ্রহণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা নির্ধারিত ছিল।
উক্ত সম্মতিপত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদ লিখিতভাবে উল্লেখ করেন, “আমি সালাহউদ্দিন আহমেদ (উপসচিব), পরিচালক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিসিএস (প্রশাসন), ২৮তম ব্যাচ, আইডি নং ১৬৫২১, স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন করছি যে, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম পদে আমাকে পদায়ন করা হলে উক্ত পদে যোগদান করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আরও উল্লেখ্য যে, জনাব মোঃ হাবিবুর রহমান, পিতা: মোঃ আবদুল মজিদ, মাতা: নুর জাহান বেগম, স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম–বগা বন্দর, ডাকঘর–বগা বন্দর-৮৬২১, উপজেলা–বাউফল, জেলা–পটুয়াখালী, পেশা–ব্যবসা, ধর্ম–ইসলাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর–৩৭৩৪২***৫৪, জাতীয়তা–বাংলাদেশি; তিনি আমার পরিচিত ব্যক্তি। আমার পক্ষ থেকে উপরোক্ত বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমি স্বেচ্ছায় সম্মতি প্রদান করলাম। সর্বোপরি, আমি দেশ ও দেশের মানুষের সেবা প্রদানে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
অনুসন্ধানের সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য প্রতিবেদকের হাতে এসেছে ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি সম্মতিপত্রে। সরকারি পদের মহড়া ও অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সালাহউদ্দিন আহমেদ সরাসরি অননুমোদিত ঋণের নামে এমন এক দলিলে সই করেছেন, যা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
তার স্বহস্তে স্বাক্ষরিত ও প্রত্যয়নকৃত উক্ত সম্মতিপত্রে হুবহু উল্লেখ রয়েছে, “আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারী, এই মর্মে প্রত্যয়ন করিতেছি যে, আমি সালাহউদ্দিন আহমেদ, উপসচিব, পরিচিত নং-১৬৫২১, পিতা: জারজিস আলী, মাতা: বেগম সামসুন্নাহার, ঠিকানা: গ্রাম-তালাইমারী পূর্বাংশ, পোস্ট: কাজলা-৬২০২, মতিহার, রাজশাহী, জাতীয় পরিচয়পত্র নং- ৩২৫১৩***৫০, জাতীয়তা: বাংলাদেশি, জন্ম তারিখ: ০৭/০১/১৯৮২ ইং, ধর্ম: ইসলাম, পেশা: চাকরি। আমি আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৫০ (পঞ্চাশ কোটি) টাকা ঋণ নিতে আগ্রহী, যাহার ৪০% সার্ভিস চার্জ ২০ (বিশ কোটি) টাকাসহ সর্বমোট ৭০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করিব যাহার দ্বিগুণ ১৪০ (একশত চল্লিশ কোটি) টাকা ১৮ মাসের কাজের মাধ্যমে পরিশোধের সম্মতি প্রদান করিলাম। উল্লেখ্য যে, ঋণ প্রদানের নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে আমি সশরীরে উপস্থিত হয়ে আপনার প্রতিষ্ঠান হতে ঋণ গ্রহণ করিব এবং ঋণ পরিশোধের সকল আনুষ্ঠানিকতা সুসম্পন্ন করিব। আরও উল্লেখ থাকে যে, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করিব এই মর্মে নিম্ন স্বাক্ষর করিলাম।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই চুক্তিপত্র হস্তান্তরের সময় সালাহউদ্দিন আহমেদ তার আপন বোন জিনিয়াত খাতুন (৪৮) এবং নিজ স্ত্রী লায়লা হাবিবাকে জামিনদার (গ্যারান্টার) হিসেবে নথিভুক্ত করেন। একই সঙ্গে জামানত হিসেবে সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর বগুড়া কর্পোরেট শাখার তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ৩টি ফাঁকা (ব্ল্যাংক) চেক প্রদান করেন।
ব্যাংকিং নথিপত্র ও হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পদায়নের পূর্বে সালাহউদ্দিন আহমেদ নির্দিষ্ট অর্থ উল্লেখ করে নিজের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মোট ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেছিলেন। যার মধ্যে সিটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৬টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি বগুড়া কর্পোরেট শাখার অ্যাকাউন্ট থেকে ৫টি চেকের মাধ্যমে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
পাশাপাশি তিনি নিজ স্বাক্ষরিত আরও ৬টি খালি (ব্ল্যাংক) চেক এবং জামানত হিসেবে ২ কোটি টাকা মূল্যমানের ২টি চেক (মোট ৪ কোটি টাকা) প্রদান করেন। এছাড়া ১০০ টাকা মূল্যমানের ৩টি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করে তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন, “প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবসায়িক কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর দুই দিনের ভিতরে পরিশোধ করিতে বাধ্য থাকিব।”
অনুসন্ধানের সমস্ত লিখিত তথ্য, সম্মতিপত্র ও ব্যাংক চেকের সত্যতা যাচাই করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভান্ডার প্রধান ও উপসচিব সালাউদ্দিন আহমেদের মুখোমুখি হলে তিনি লেনদেনের সত্যতা সরাসরি স্বীকার করে নেন।
তিনি অনুনয় করে বলেন, “আমি এই চেকগুলো লবিং এবং তদবিরের জন্য দিয়েছি। আসলে এসব দেওয়াটা আমার অন্যায় হয়েছে। আপনারা এসব প্রচার করবেন না। প্রচার করলে এতে আমার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে।”
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি লঙ্ঘন করে সরকারের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে এমন বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। অপরাধের ধরন বিবেচনায় এটি ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা, পেনাল কোডের ১৬১/১৬২ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের অধীনে সুস্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালতে উক্ত কর্মকর্তার সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং অবৈধ লেনদেনের সমুদয় অর্থ বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া চালু হলে তার শাস্তি আরও কঠোর হবে।
সিএক্স/রয়েল





