১ হাজার ৪৯৮ পর্যটন স্পট ঘিরে মহাপরিকল্পনা, আঞ্চলিক হাব হবে কক্সবাজার

নিউজ ডেস্ক | চট্টলা এক্সপ্রেস

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন থেকে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, পাহাড়-হ্রদ, সিলেটের চা-বাগান কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় স্থাপনা প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে রয়েছে বিস্তৃত সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারকে আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার-২০২৬ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা কয়েকটি পরিচিত গন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

১ হাজার ৪৯৮ আকর্ষণ নিয়ে মহাপরিকল্পনা

পর্যটন খাতের সম্ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে সরকার দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

পরিকল্পনায় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ধর্মীয় পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর মাধ্যমে শুধু প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনাকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারকে আঞ্চলিক পর্যটন হাব করার পরিকল্পনা

দেশের পর্যটন উন্নয়নে কক্সবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারকে একটি আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।

এ পরিকল্পনার আওতায় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং পর্যটকদের জন্য বৈচিত্র্যময় সেবা ও পর্যটন পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পর্যটনে জিডিপির অবদান ৮-৯ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য

বর্তমানে দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। সরকারের লক্ষ্য আগামীতে এই অবদান ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করা।

পর্যটনকে শুধু বিনোদন বা ভ্রমণের খাত হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে জোর

পর্যটন খাতের অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, পর্যটনের কাঙ্ক্ষিত বিকাশের জন্য সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারে ১০ দেশের অংশগ্রহণ

এবারের এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারে বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। প্রায় ৩০০টি স্টলে বিভিন্ন দেশের পর্যটন গন্তব্য, পর্যটন পণ্য ও সেবা তুলে ধরা হচ্ছে।

মেলায় পর্যটন প্রদর্শনীর পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। রয়েছে বি-টু-বি সেশন, সেমিনার, প্যানেল আলোচনা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন আয়োজন।

আয়োজকদের মতে, মেলাটি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পর্যটন, ব্যবসা ও বিনিয়োগের যোগাযোগ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার গুরুত্ব

পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মানুষকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আতিথেয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও পরিচিত করার লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের আওতায় আনা এবং কক্সবাজারকে আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা সেই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।

সিএক্স/রয়েল