আকাশি-সাদা অধ্যায় শেষ, মেসির নতুন ঠিকানা এবার ফুটবলের নেপথ্যে?

চট্টলা এক্সপ্রেস ডেস্ক:

একসময় যে মাঠে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে প্রতিটি অনুশীলন ছিল স্বাভাবিক রুটিন, সেই পরিচিত দৃশ্যই এবার হয়ে উঠল বিদায়ের প্রতীক। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের আগে সতীর্থদের সঙ্গে শেষ অনুশীলনে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। মাঠে ছিল চেনা পরিবেশ, চেনা মুখ; কিন্তু মেসির জন্য মুহূর্তটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে যে পথচলা, তার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। জাতীয় দলের ক্যাম্প, সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন, দেশজুড়ে ভ্রমণ, গ্যালারিভর্তি সমর্থকদের সামনে জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলানো এসব পরিচিত দৃশ্য এখন ধীরে ধীরে স্মৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে।

শেষ অনুশীলনের কয়েকটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে মেসিও বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই সময়টা তার কাছে কতটা আবেগের। বিশেষ মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করে সতীর্থ ও আর্জেন্টিনার পতাকার প্রতি ভালোবাসা জানিয়েছেন তিনি।

আকাশি-সাদা থেকে গোলাপি জার্সিতে

আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের সমাপ্তির পর মেসির ক্লাব ফুটবলের কেন্দ্র এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামি। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের এমএলএস মৌসুম পর্যন্ত মায়ামির গোলাপি জার্সিতেই তাকে দেখা যাওয়ার কথা।

তবে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে আটকে নেই। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর ফুটবলের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত থাকবেন এ প্রশ্নও এখন সামনে আসছে।

কোচ হিসেবে ডাগআউটে দাঁড়ানোর চেয়ে ক্লাব পরিচালনা ও মালিকানার দিকেই মেসির আগ্রহ বেশি সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। মাঠের বাইরে ব্যবসা ও ফুটবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে তার।

কোচ নয়, ক্লাব পরিচালনাতেই আগ্রহ?

ফুটবল কোচের দায়িত্ব যে কতটা চাপের, সেটি মেসির অজানা নয়। ম্যাচের ফল, দল নির্বাচন, কৌশল, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোচের ভবিষ্যৎ।

অন্যদিকে ক্লাবের মালিক বা পরিচালকের ভূমিকায় থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। মেসির আগ্রহও যেন সেদিকেই।

তিনি আগেই জানিয়েছেন, ব্যবসার জগৎ তাকে আকৃষ্ট করে এবং এ বিষয়ে আরও শেখার ইচ্ছা রয়েছে। তবে তার ব্যবসায়িক আগ্রহের কেন্দ্রও যে ফুটবল, সেটি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।

খেলোয়াড় থেকে ফুটবল বিনিয়োগকারী

ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাব ও একাডেমিতে মেসির সম্পৃক্ততা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি আভাস দিচ্ছে। স্পেনের নিম্নস্তরের ক্লাব ইউই কর্নেয়ার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এবং সিডি এলদেনসেতে বিনিয়োগ দুটিই ফুটবলের ব্যবসায়িক ও সাংগঠনিক দিক নিয়ে তার আগ্রহের ইঙ্গিত বহন করে।

বিশেষ করে এলদেনসের কার্যক্রমের প্রতি তার নজর রয়েছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগেই ফুটবলের আরেকটি দুনিয়ার সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করে তুলছেন তিনি।

শৈশবের ক্লাবও ভুলে যাননি

মেসির ফুটবল ভাবনায় জায়গা করে আছে তার শৈশবের ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজও। ছোটবেলায় যে ক্লাবের হয়ে ফুটবলের প্রাথমিক স্বপ্ন দেখেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবলারদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

মায়ামিতে তার নামে গড়ে ওঠা একাডেমিক কার্যক্রমেও সেই ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। বিভিন্ন নামী ইউরোপীয় ক্লাবের একাডেমির সঙ্গে তরুণ ফুটবলারদের প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে সেখানে।

নিজের অর্থ, সময় ও অভিজ্ঞতা দিয়ে তরুণদের ফুটবল উন্নয়নে যুক্ত হওয়া মেসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

মাঠ ছাড়লেও ফুটবল ছাড়ছেন না মেসি

লিওনেল মেসির খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারের শেষ কবে তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই। শরীর ও মন যতদিন অনুমতি দেবে, ততদিন মাঠে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে মেসি যখন একদিন বুটজোড়া তুলে রাখবেন, তখনও ফুটবল থেকে দূরে সরে যাবেন না।

হয়তো তখন তার হাতে থাকবে না বল, গায়ে থাকবে না ম্যাচের জার্সি। কিন্তু থাকতে পারে একটি ক্লাব, একাধিক একাডেমি কিংবা নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের গড়ে তোলার বড় পরিকল্পনা।

আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে তার অধ্যায় শেষের পথে। এরপর মায়ামির গোলাপি জার্সিতে চলবে তার খেলোয়াড়ি গল্প। আর তার পরের অধ্যায়?

সম্ভবত মাঠের মাঝখানে নয় ফুটবলের নেপথ্যে, যেখানে একজন কিংবদন্তি নিজেই তৈরি করবেন ভবিষ্যতের আরও অনেক ‘মেসি’।

সিএক্স/রয়েল