আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় একের পর এক গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার, পেপার মিল, পিয়ার-রিভিউ কারচুপি, সাইটেশন রিং ও ডিজিটাল পরিচয় অপব্যবহারের অভিযোগ; তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ২০২৪ সালের সিমাগো ইনস্টিটিউশনস র্যাঙ্কিং (SCImago Institutions Rankings)-এ দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করে ব্যাপক আলোচনায় আসে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাফল্যের অন্যতম কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক তালহা বিন ইমরানকে, যার গবেষণা প্রকাশনা ও সাইটেশনকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে সেই গবেষকের বিরুদ্ধেই বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গবেষণা জালিয়াতি, পেপার মিল, পিয়ার-রিভিউ কারচুপি, সাইটেশন রিং এবং ডিজিটাল পরিচয় অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক ডেটাবেস, বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার রিট্র্যাকশন নোটিশ এবং গবেষকের অরকিড (ORCID) প্রোফাইল পর্যালোচনায় দেখা যায়, Springer Nature, Wiley (Hindawi), Elsevier (ScienceDirect), Frontiers এবং Taylor & Francis এই পাঁচ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে তালহা বিন ইমরানের নামে প্রকাশিত অন্তত ১০টি গবেষণা নিবন্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার (Retracted) করা হয়েছে।
প্রত্যাহার হওয়া নিবন্ধগুলোর পর্যালোচনায় প্রকাশনা সংস্থাগুলো গবেষণায় অনৈতিক লেখক অন্তর্ভুক্তি, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রকাশনা প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উল্লেখ করেছে।
সহ-লেখকদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের এমন বহু গবেষকের নাম যুক্ত করা হয়েছে, যাদের গবেষণার মূল পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ল্যাবভিত্তিক কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উদাহরণ হিসেবে, Springer Nature-এর Journal of Cluster Science-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব ও বাংলাদেশের গবেষকদের একসঙ্গে সহ-লেখক হিসেবে দেখানো হয়েছে। একইভাবে Heliyon ও Chemosphere-এ প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় চীন ও পাকিস্তানের একাধিক গবেষকের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাদের সংশ্লিষ্ট গবেষণার মূল পরীক্ষামূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক প্রকাশনাগুলোর রিট্র্যাকশন নোটিশে মূলত তিনটি গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে
প্রকৃত গবেষণা বা পরীক্ষার পরিবর্তে কৃত্রিম তথ্য ব্যবহার এবং অর্থের বিনিময়ে লেখক অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ, যা পেপার মিল কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভুয়া ই-মেইল ও রিভিউয়ার পরিচয় ব্যবহার করে নিজস্ব গবেষণাপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা (Peer-Review Rigging)
নিজেদের গবেষণাপত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরস্পরের নিবন্ধ উদ্ধৃত করে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন বৃদ্ধি করা (Citation Ring)
অভিযোগ রয়েছে, এই অস্বাভাবিক সাইটেশন সংখ্যার প্রভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে উঠে আসে।
এদিকে বিতর্ক প্রকাশ্যে আসার পর নিজের ডিজিটাল পরিচয় আড়াল করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তালহা বিন ইমরানের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তাঁর Google Scholar প্রোফাইলের নাম ও ছবি পরিবর্তন করে বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষক মিসবাহ উদ্দিন ইমরান-এর নাম ও পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে গবেষকের স্থায়ী ORCID নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রের DOI (Digital Object Identifier) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নাম পরিবর্তন করা হলেও বিতর্কিত গবেষণা ও সাইটেশনগুলোর প্রকৃত দায় তালহা বিন ইমরানের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তালহা বিন ইমরান ২০২২ সাল থেকে শিক্ষা ছুটিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগ দেননি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শিক্ষা ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে অবগত থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দীর্ঘ সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক ফোরামে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ফার্মেসি বিভাগের একজন শিক্ষক আন্তর্জাতিক বিতর্ক আড়াল করতে তাঁদের বিভাগের সাবেক শিক্ষকের পরিচয় ব্যবহার করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ইনচার্জ) ড. এস. এম. শোয়েভ বলেন,
“স্টাডি লিভে গেলে প্রতি বছর আমাদের আপডেট দিতে হয়। কিন্তু তিনি ২০২৫ সাল থেকে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। তাই শিক্ষক হিসেবে আমরা তাঁকে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছি না।”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন,
“আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা জরুরি বৈঠক করেছি এবং তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করেছি। তিনি দীর্ঘদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডির জন্য গেছেন এবং আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেননি। তাই তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
গবেষণা জালিয়াতির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ডিগ্রির মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন,
“এটি মূলত তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব পড়ার কথা নয়। যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে গবেষণা করেছেন, সেটি আলাদা বিষয়।”
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তালহা বিন ইমরানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে সংযোজন করা হবে।
সিএক্স/রয়েল






