সাবেক সচিব মিলনের চ্যালেঞ্জ: ‘মাত্র এক মাসের ক্ষমতা দিন, রেলের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করে দেখাব’

ঢাকা–চট্টগ্রাম ও ঢাকা–কক্সবাজার রুটে পরীক্ষামূলক উদ্যোগের প্রস্তাব, পদ-পদবি নয়, চাইলেন প্রশাসনিক ক্ষমতা ও সহযোগিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা–চট্টগ্রাম ও ঢাকা–কক্সবাজার রুটে রেলের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মাত্র এক মাসের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ক্ষমতা চেয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন। নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ দাবি জানান। তাঁর ভাষ্য, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, সীমিত জনবল ও আইন প্রয়োগের সহযোগিতা পেলে এই দুই রুটে টিকিটের অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।

দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো পদ-পদবি, আলাদা দপ্তর কিংবা চেয়ার-টেবিল চান না বলে জানিয়েছেন তিনি। বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে শুধু যাতায়াতের জন্য একটি গাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ওপর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব চেয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, এক মাসের জন্য দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হলে কাজের অগ্রগতি ও ফলাফল জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে।

টিকিটের অনিয়ম ধরতে বিশেষ তদারকির প্রস্তাব

প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় টিকিট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি চালুর কথা বলেছেন মাহবুব কবির মিলন। প্রতিটি যাত্রীর টিকিট পরীক্ষা না করে প্রতি কোচ থেকে দৈবচয়নভিত্তিতে যাত্রী নির্বাচন করে পরিচয় ও টিকিট যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী দ্বিগুণ জরিমানা আরোপের কথাও উল্লেখ করেছেন।

তাঁর প্রস্তাবের মূলনীতি ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’। অর্থাৎ যে ব্যক্তির নামে টিকিট ইস্যু করা হবে, ভ্রমণ করবেন সেই যাত্রীই। অপ্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীদের টিকিটের সঙ্গে বাবা অথবা মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।

টিকিট পরীক্ষক, চেকার ও গার্ডের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাঁদের শরীরে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের কথা বলেছেন সাবেক এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, এতে দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়মের অভিযোগ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের পরিকল্পনা

এক মাসের বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনায় অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত টিকিট পরীক্ষকদের চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন মাহবুব কবির মিলন। পাশাপাশি কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোনো বেতন-ভাতা নেবেন না। তবে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।

অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তাও চেয়েছেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে ম্যাজিস্ট্রেটদের বিশেষ দায়িত্ব শেষ হবে। পরবর্তী সময়ে পুলিশি সহযোগিতায় টিকিট পরীক্ষাসহ তদারকি কার্যক্রম চালানো হবে।

তবে জরিমানা, পরিচয় যাচাই, যাত্রীসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ এবং বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রচলিত আইন, বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

টিকিট বিক্রির সময়সূচিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব

টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন ছাড়ার তিন থেকে পাঁচ দিন আগে টিকিট ইস্যু করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর ধারণা, টিকিট বিক্রি ও যাত্রী যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব হবে।

এ ছাড়া ঢাকা–চট্টগ্রাম ও ঢাকা–কক্সবাজার রুটে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সমন্বিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের দাবি
প্রস্তাবটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আরএনবির (RNB) ভূমিকা ও কার্যক্রম পুনর্গঠন। মাহবুব কবির মিলনের অভিযোগ, বাহিনীটির মূল দায়িত্ব ও আইনগত ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। তাঁর দাবি, টিকিট পরীক্ষা ও অর্থসংক্রান্ত কাজে বাহিনীটির সদস্যদের ব্যস্ত রাখার পরিবর্তে রেলওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় তাদের কার্যকরভাবে নিয়োজিত করা উচিত।

এ লক্ষ্যে বাহিনীটির আইনগত কাঠামো কার্যকর করা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

তাঁর মতে, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে আধুনিক ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্যকর তদারকি এবং সরকারি রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি)-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন, বাহিনীর এখতিয়ার এবং প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

‘ব্যর্থ হলে শাস্তি মেনে নেব’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে দেওয়া আবেদনে মাহবুব কবির মিলন বলেছেন, দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে তিনি এক মাসের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। এ জন্য তাঁকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক স্বাধীনতা দিতে হবে এবং কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখতে হবে বলে দাবি করেছেন তিনি।

টিকিটের অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের পক্ষে তদবির কিংবা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশের কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরো কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ফলাফল নিয়মিতভাবে জনগণকে জানানো হবে।

প্রস্তাবটির শেষাংশে প্রধানমন্ত্রীকে পরীক্ষামূলকভাবে এক মাসের জন্য ঝুঁকি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক এই কর্মকর্তা। তাঁর বক্তব্য, উদ্যোগটি ব্যর্থ হলে যেকোনো শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ে সফলতা এলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য রেলপথেও একই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে।

বাস্তবায়নে প্রয়োজন পরিকল্পনা, আইন ও জবাবদিহি

রেলের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ, যাত্রী পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা জোরদার এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে একজন ব্যক্তিকে বিস্তৃত প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, জরিমানার বিধান, যাত্রীদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনগত সীমা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি।

প্রস্তাবটির বাস্তবতা মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বিদ্যমান টিকিট ব্যবস্থার দুর্বলতা, কালোবাজারি প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপ এবং প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সম্ভাব্য ব্যয় ও কার্যকারিতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

সিএক্স/রয়েল