ছাদে সোলার বসাতে মিলবে কম সুদের ঋণ, সরকারের তহবিল ১,৫০০ কোটি

সর্বোচ্চ ৫% সুদে মিলবে ঋণ, ১০ বছর মেয়াদে ছাদে সোলার থেকে শিল্পের বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন

চট্টলা ডেক্স:

জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে বড় ধরনের অর্থায়ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ঋণ তহবিল গঠন করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মঙ্গলবার জারি করা এক পরিপত্রে তহবিলটির কাঠামো ও ঋণ বিতরণের বিভিন্ন শর্ত তুলে ধরা হয়েছে। এ তহবিল থেকে নেওয়া ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর, যার মধ্যে প্রথম এক বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে বিবেচিত হবে। সুবিধাভোগী পর্যায়ে সব ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক সুদের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেসব কাজে মিলবে ঋণ

নতুন তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে আবাসিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা স্থাপন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা যাবে।
এর আওতায় থাকছে

ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন,

নেট মিটারিং সংযোগসহ রুফটপ সোলার প্রকল্প,

সোলার হোম সিস্টেম,

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন,

সৌরচালিত সেচ পাম্প,

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা,

এসব ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইনভার্টার, মিটার ও ব্যাটারি।

সরকারের লক্ষ্য হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানো। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

তহবিলের টাকা যাবে তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এসএমই খাতের জন্য রাখা ২ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা এ তহবিলে দেওয়া হবে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা সরকারের অপারেটিং লোন থেকে সংস্থান করা হবে।

মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সমানভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০০ কোটি টাকা করে ঋণ দেবে সরকার। তাদের সঙ্গে ঋণচুক্তির ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে এবং তারা সরাসরি অথবা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চূড়ান্ত সুবিধাভোগীদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।

সরকার থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের নেওয়া ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ।

ঋণগ্রহীতার জন্য সুদের সীমা ৫ শতাংশ

চূড়ান্ত পর্যায়ে যারা এ তহবিল থেকে ঋণ নেবেন, তাদের জন্য সব ধরনের ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক সুদের হার কোনোভাবেই ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর হলেও প্রথম এক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। ফলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে প্রকল্প চালু করার পর ঋণ পরিশোধের জন্য সুবিধাভোগীরা একটি নির্দিষ্ট সময় পাবেন।

তবে তহবিলের অর্থ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ, ঋণ এভারগ্রিনিং, জমি বা শেয়ার কেনা, ব্যক্তিগত ভোগ, সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয় কিংবা অন্য কোনো প্রকল্প বা তহবিলে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে না।

প্রতি তিন মাসে দিতে হবে অগ্রগতির হিসাব

তহবিল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না, এর মাধ্যমে বাস্তবে কতটা সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে তারও হিসাব দিতে হবে।

পরিপত্র অনুযায়ী, প্রতি ত্রৈমাসিক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানাতে হবে কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন হয়েছে, কতজন বা কতটি প্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েছে এবং ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি কী।

এ ছাড়া অর্থবছর শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষিত হিসাবসহ বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি অর্থনীতিবিদ শফিকুল আলম উদ্যোগটিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হলে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আগ্রহ বাড়তে পারে।

তবে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শুধু ঋণ সুবিধা যথেষ্ট নাও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, যাদের ঋণ নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সক্ষমতা নেই, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মূলধনী ভর্তুকি বা প্রণোদনা বিবেচনা করা যেতে পারে।

অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদও উদ্যোগটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বড় অঙ্ক হলেও সারা দেশে এটি ছড়িয়ে দিতে হলে ঋণের পরিমাণ, প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং অর্থ ব্যবহারের নজরদারি সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য ২০ শতাংশ

দেশের জ্বালানি সংকট ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

সৌরবিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নিতে সম্প্রতি আমদানি পর্যায়েও করছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ১৬ সেপ্টেম্বরের আদেশ অনুযায়ী, শিল্পে ব্যবহারের জন্য সৌরবিদ্যুতের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে এসব যন্ত্রপাতি ১ শতাংশ শুল্কে আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিল্পের বাইরের বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্যও সৌরবিদ্যুতের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ১ শতাংশ শুল্কে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি করের হার পণ্যভেদে ২৩ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।

এর পাশাপাশি বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে নেট মিটারিং সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নেট মিটারিংয়ের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, স্বল্প সুদের ঋণ, করছাড় ও নেট মিটারিং এই তিন ধরনের সুবিধাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটাতে চাইছে সরকার। এখন মূল প্রশ্ন, ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই তহবিল কতটা স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বিতরণ হয় এবং বাস্তবে কতটা নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।

সিএক্স/রয়েল