আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে দেশজুড়ে নজরদারি, এলাকাভিত্তিক নেতাকর্মীদের তালিকা করছে পুলিশ

চট্টলা ডেক্স:

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক তৎপরতা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, অনলাইন যোগাযোগ ও নাশকতার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে থানাভিত্তিক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করে এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরির কাজ চলছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব তালিকা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ সহজ হবে।

হঠাৎ মিছিল, মুহূর্তেই উধাও

পুলিশ সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ছোট ছোট ঝটিকা মিছিলের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। কখনো ভোরে, কখনো দিনের ব্যস্ত সময়ে সড়কে স্বল্প সময়ের জন্য জড়ো হয়ে মিছিল করে দ্রুত সরে যাওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কর্মসূচির বিষয়ে অনেক সময় শেষ মুহূর্তে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঘটনাস্থলে দ্রুত পুলিশ পৌঁছালেও মিছিলকারীদের শনাক্ত বা আটক করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

যোগাযোগের কৌশলেও পরিবর্তন

গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত জুম বা হোয়াটসঅ্যাপের পরিবর্তে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে যোগাযোগ ও বৈঠক করার বিষয়টিও নজরদারিতে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে এসব যোগাযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি কী তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাচাই করছে বলে জানা গেছে।

এলাকাভিত্তিক তালিকায় থাকছে নানা তথ্য

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তৈরি করা তালিকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নাম, সাংগঠনিক পদ, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি এবং বর্তমানে দেশে না বিদেশে অবস্থান করছেন এসব তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও এ তথ্য সংগ্রহের কাজে যুক্ত রয়েছেন।

ঢাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে

রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকায় চেকপোস্ট এবং তল্লাশি কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের মোবাইল, ফুট ও মোটরসাইকেল টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকেও বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রাখা হয়েছে বলে ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সন্দেহজনক যানবাহন ও ব্যক্তিদের ওপর নজরদারির পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও সাইবার ইউনিটের পর্যবেক্ষণ বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

গুলশানের মিছিলের পর সতর্কতা

পুলিশ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান এলাকায় একটি মিছিলের বিষয়ে কর্মসূচি শুরুর অল্প সময় আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য পৌঁছায়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় মিছিলকারীদের আটক করা যায়নি।

এ ঘটনার পর বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।

গ্রেপ্তার অভিযানও অব্যাহত

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া ও গ্রেপ্তার অভিযান আগে থেকেই চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যসহ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নাশকতা বা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নাশকতার আশঙ্কায় বাড়তি সতর্কতা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বিভিন্ন ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে নাশকতার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য না করার বিষয়টিও আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইন তৎপরতাও নজরদারিতে

মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, অনলাইনে কোনো ধরনের উসকানি, সহিংসতার পরিকল্পনা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর প্রচেষ্টা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম অ্যান্ড অপস বিভাগের অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার ও তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেও তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

ডিএমপির কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, রাজধানীতে কেউ ঝটিকা মিছিল বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামনে আরও কঠোর নজরদারি

সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতাকে ঘিরে মাঠ প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার হচ্ছে। এলাকাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা তৎপরতা, চেকপোস্ট ও টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি অনলাইন কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যেসব দাবি বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে স্বাধীন যাচাই ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যুক্ত করা হলে প্রতিবেদনটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

সিএক্স/রয়েল