ব্রেন্ট নেমেছে ১০১ ডলারে, ডব্লিউটিআই ৯৮ ডলারে—বাংলাদেশে ডিজেল ১৩৫, পেট্রোল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা
নিউজ ডেক্স: চট্টলা এক্সপ্রেস
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত ঘিরে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একই দিনে বাংলাদেশে নতুন করে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে।
অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়ার দিনই বাংলাদেশে ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি তেলের নতুন বাড়তি দাম কার্যকর হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অপরিশোধিত তেলের দাম এবং দেশের পাম্পে বিক্রি হওয়া পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একই সময়ে একই হারে ওঠানামা করে না। আমদানি ব্যয়, ফ্রেইট, পরিশোধন, কর-শুল্ক, বিনিময় হার ও স্থানীয় মূল্য নির্ধারণ কাঠামোও এতে ভূমিকা রাখে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বাংলাদেশ সময় সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.১৬ ডলার বা ২.০৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১.৭১ ডলারে নেমে যায়। দিনের শুরুতে এটি ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়েও পৌঁছায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২.১৫ ডলার বা ২.১৪ শতাংশ কমে ৯৮.১৫ ডলারে নেমে আসে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনা এবং সৌদি আরবের তেল সরবরাহ আংশিকভাবে পুনরুদ্ধারের খবর আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে নতুন দাম কত?
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টা থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দামে
ডিজেল: ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা
কেরোসিন: ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা
পেট্রোল: ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা
অকটেন: ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা
অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানির প্রতিটির দামই এক লাফে ২০ টাকা করে বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৭.৪ শতাংশ, পেট্রোল ১৪.৩ শতাংশ, কেরোসিন ১৪.৮ শতাংশ এবং অকটেন ১৩.৮ শতাংশ।
সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু বিশ্ববাজারে আজ তেলের দাম কমল কেন?
আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক দামের বড় চালক ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলার কারণে বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
তবে সৌদি আরবের কিছু তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং সংঘাত কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতার সম্ভাবনায় সেই উদ্বেগের একটি অংশ কমেছে। ফলে তেলের দামে যে অতিরিক্ত ‘ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যুক্ত হয়েছিল, তার কিছুটা বাজার থেকে সরে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লিটারে কত?
এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে প্রায় ১৫৯ লিটার থাকে। সোমবারের ব্রেন্টের প্রায় ১০২ ডলার দরের হিসাবে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৭৮–৭৯ টাকা প্রতি লিটার।
ডব্লিউটিআইয়ের প্রায় ৯৮ ডলার দরে অপরিশোধিত তেলের মূল্য দাঁড়ায় আনুমানিক ৭৬ টাকা প্রতি লিটার।
তবে এটিকে বাংলাদেশের পাম্পের দাম হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ অপরিশোধিত তেল আমদানির পর পরিশোধন, পরিবহন, বীমা, ফ্রেইট, কর-শুল্ক, বিপণন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়।
ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা-চীনের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম কত?
দেশভেদে জ্বালানির মান, কর ব্যবস্থা, ভর্তুকি, বিনিময় হার ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আলাদা। তাই তুলনার ক্ষেত্রে ডিজেলের প্রতি লিটারের খুচরা মূল্য একটি সহজ সূচক হিসেবে ধরা যায়।
২১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ডিজেলের নতুন দাম ১৩৫ টাকা প্রতি লিটার। ভারতের কলকাতায় একই দিনে ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ৯৯.৮২ ভারতীয় রুপি, যা ১ রুপি = ১.২৭ টাকা হিসাবে প্রায় ১২৭ টাকা। অর্থাৎ কলকাতার তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেল প্রায় ৮ টাকা বেশি।
পাকিস্তানে ১৯–২১ সেপ্টেম্বর কার্যকর ডিজেলের দাম ৪২৪.০৪ পাকিস্তানি রুপি। আর বাংলাদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তুলনামূলক হিসাবে পাকিস্তানে ডিজেলের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮৫.৪৮ টাকা প্রতি লিটার উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও মন্ত্রণালয়ের তুলনামূলক হিসাবে ডিজেলের দাম প্রায় ১৭৯.৪২ টাকা প্রতি লিটার। অর্থাৎ বাংলাদেশের নতুন ১৩৫ টাকার দামের চেয়ে প্রায় ৪৪ টাকা বেশি।
চীনের ক্ষেত্রে ২১ সেপ্টেম্বর সাংহাইয়ে ০-গ্রেড ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ৭.৯৫ ইউয়ান বা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১৪৬ টাকা প্রতি লিটার। অর্থাৎ চীনের তুলনায় বাংলাদেশের নতুন ডিজেলের দাম প্রায় ১১ টাকা কম।
এক নজরে ডিজেলের দাম
দেশ/অঞ্চল
ডিজেলের দাম (প্রতি লিটার, আনুমানিক)
বাংলাদেশের তুলনায়
🇧🇩 বাংলাদেশ ১৩৫ টাকা
🇮🇳 ভারত, কলকাতা-প্রায় ১২৭ টাকা
বাংলাদেশে প্রায় ৮ টাকা বেশি
🇨🇳 চীন, সাংহাই-প্রায় ১৪৬ টাকা
বাংলাদেশে প্রায় ১১ টাকা কম
🇱🇰 শ্রীলঙ্কা-প্রায় ১৭৯ টাকা
বাংলাদেশে প্রায় ৪৪ টাকা কম
🇵🇰 পাকিস্তান-প্রায় ১৮৫ টাকা
বাংলাদেশে প্রায় ৫০ টাকা কম
নোট: দেশভেদে জ্বালানির গ্রেড, কর, স্থানীয় বাজার ও বিনিময় হার আলাদা হওয়ায় এই হিসাব সরাসরি ক্রয়ক্ষমতা বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনা নয়। বিশেষ করে ভারত ও চীনে অঞ্চলভেদে জ্বালানির দাম পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশে দাম বাড়ার আরেকটি কারণ—বিপিসির লোকসান
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম বড় যুক্তি হলো আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া। বিপিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাজারে আমদানি করা জ্বালানি তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে।
বিশেষ করে ডিজেলের ব্যবহার দেশের পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যাপক। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির জ্বালানি ব্যয় নয় পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের খরচ এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার বর্তমান প্রবণতা কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সৌদি আরবের সরবরাহ পুনরুদ্ধার, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।
কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে বা সরবরাহপথে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে দাম আবারও বাড়তে পারে।
২১ সেপ্টেম্বরের চিত্রটি তাই দুই বিপরীত বাস্তবতা দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমেছে, কিন্তু একই দিন বাংলাদেশে নতুন করে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের আগের উচ্চমূল্য, আমদানি ও ফ্রেইট ব্যয়, বিপিসির বড় লোকসান এবং দেশের জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত।
সূত্রঃ সিএনবিসি
সিএক্স/রয়েল






