২০ লাখ টাকার অনুদান তুলে দিলেন আয়োজকদের হাতে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী যাত্রা মোহন সেন হলের (জে এম সেন হল) দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান জে এম সেন হলে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন করলেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার নাথ। এ সময় পূজা উদ্যাপন কমিটির প্রতিনিধিদের হাতে ২০ লাখ টাকার একটি চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) রাত সোয়া আটটার দিকে দলীয় নেতা-কর্মী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি পূজামণ্ডপে উপস্থিত হন। তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে আয়োজক ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।
এর আগে একই দিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সামরিক বিমানে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।
সম্প্রীতি ও নাগরিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব
জে এম সেন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক দেশ নয়, এ দেশ সব নাগরিকের। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হলেও রাষ্ট্রের পরিচয়ে সবাই বাংলাদেশি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার জড়িয়ে রয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের আলাদা করে দেখার পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও জাতীয় পরিচয়কে সামনে রেখে দেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই-আগস্ট ঐক্যের উদাহরণ
বক্তব্যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন এবং যাঁরা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের মূল্যায়নে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য ছিল না। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগই ছিল প্রধান শক্তি।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গুলিবিদ্ধ ও আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার, হাসপাতালে নেওয়া কিংবা চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ধর্ম পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি এমন উদাহরণ তুলে ধরে তিনি মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।
সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নয়, সবার পরিচয় বাংলাদেশি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সংখ্যাগুরু কিংবা সংখ্যালঘু এই বিভাজন দিয়ে মানুষের অধিকার নির্ধারণ করা উচিত নয়। বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বোঝান, কোনো দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু হওয়ার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার পরিচয় ও অধিকার সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের কাছ থেকে একজন নাগরিক যে অধিকার ও সুযোগ পাবেন, অন্য নাগরিকও তা পাওয়ার অধিকার রাখেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে ২০২৪ সালের আন্দোলন পর্যন্ত মানুষের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সবাই শান্তিতে ও মিলেমিশে বসবাস করতে পারবেন।
কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা কামনা
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনসহ দলীয় নেতা-কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার নাথের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চট্টগ্রামের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর তারেক রহমানই প্রথম সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সমান নাগরিক অধিকার এবং জাতীয় ঐক্যের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে। তাঁর বক্তব্যে সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে দেশ গড়ার প্রত্যাশাই ছিল মূল প্রতিপাদ্য।
সিএক্স/রয়েল






