দেশব্যাপী সন্ত্রাসী তৎপরতায় নজর, ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে অভিযানের ভাবনা

বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি ঘিরে হামলা-ভাঙচুর ও দখলচেষ্টায় বাড়ছে উদ্বেগ, যৌথ অভিযানের বিষয়টি আলোচনায়

চট্টলা ডেক্স:

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিরোধপূর্ণ জমি ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র। সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা, ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার ঘটনায় পুরোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও।

ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে জমি ও সম্পত্তির বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘাতের চিত্র পাওয়া গেছে। কোথাও হামলা ও ভাঙচুর, কোথাও দখলের চেষ্টা এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, জমির মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও জমি দখল, চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে অপরাধীচক্রের পুরোনো কৌশল পুরোপুরি বদলায়নি। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা বিভিন্ন পক্ষের নাম ব্যবহার করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রকদের আড়ালে রাখার চেষ্টাও থাকতে পারে বলে তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান চালানোর বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে কোনো অভিযান হবে কি না, সেটি এখনো চূড়ান্ত নয়। বিষয়টি প্রাথমিক আলোচনা ও পর্যালোচনার পর্যায়েই রয়েছে বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দা নজরদারিতে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও অপরাধের ঘটনায় সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব ঘটনায় ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সম্পত্তির স্বার্থ এবং স্থানীয় আধিপত্যের বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, অপরাধীদের শুধু মাঠপর্যায়ে গ্রেপ্তার না করে অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী ও নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। এ কারণে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ অভিযান পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

ইসিবি চত্বরের ঘটনায় পুরোনো দ্বন্দ্বের তথ্য

সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা ও ভাঙচুরের পেছনে দীর্ঘদিনের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। সম্পত্তিটির মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ঘটনার আগে ও পরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ, হুমকি এবং লোকজন জড়ো করার অভিযোগও তদন্তে এসেছে। এ ঘটনায় বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনের নামও তদন্তসংশ্লিষ্টদের আলোচনায় এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, হামলার ঘটনায় অস্ত্রধারী লোকজন অংশ নেয় এবং একটি স্টুডিওতে ভাঙচুর চালানো হয়। ঘটনাটিকে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।

নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার দাবি, হামলার আগে তাকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর আগে জুলাই যোদ্ধা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরকে সেখানে একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।

বাড্ডা ক্লিনিক ঘিরেও দখলচেষ্টার অভিযোগ

মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকের সম্পত্তি নিয়েও নতুন করে বিরোধের তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত এই চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে একটি পক্ষ সক্রিয় হয়।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতের পর সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনাটির সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীচক্র ও প্রভাবশালী মহলের কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

চাঁদ উদ্যান ও শ্যামলী হাউজিংয়ে আতঙ্ক

মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকাতেও জমি দখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব এলাকায় বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্প, সরকারি জমি এবং প্রবাসীদের মালিকানাধীন বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে দখলচেষ্টার অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন অপরাধীচক্রকে ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি কিংবা জমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নাম বা ব্যানার ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে কি না, সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে।

কঠোর অভিযানের ইঙ্গিত

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি ইন্ধনদাতাদেরও শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে এবং প্রয়োজনে তা আরও জোরদার করা হবে।

তিনি আরও জানান, নতুন করে সক্রিয় হওয়া অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদার মতে, প্রতিটি অপরাধের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, তা শনাক্ত করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তার ভাষ্য, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি শনাক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।

রাজধানীর একাধিক এলাকায় জমি ও সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘাতের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব ঘটনার পেছনে শুধু স্থানীয় বিরোধ, নাকি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের বৃহত্তর কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান তদন্ত এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এর উত্তর মিলবে।

সিএক্স/রয়েল