‘দলীয় পরিচয় নয়, অপরাধই মুখ্য’—বিএনপিতে শুদ্ধি অভিযানের বার্তা

চট্টলা ডেক্স:

দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অনিয়ম ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলীয় সূত্রের দাবি, অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি কতটা প্রভাবশালী কিংবা কোন পদে রয়েছেন তা বিবেচনায় না নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের পর বিএনপির অভ্যন্তরে শুদ্ধি ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের আলোচনা জোরালো হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে যুবদল ও ছাত্রদলের মহানগর পর্যায়ের কয়েকটি কমিটিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এরপরই দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনায় আসে কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দখলদারি, চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার, ব্যবসা বা জমি নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেলে সেগুলো যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

কমিটি বিলুপ্তির পর বাড়ছে নজরদারি

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির ঘটনা দলীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। একই সময়ে উত্তর মহানগর যুবদল ও পশ্চিম মহানগর ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে সাংগঠনিক দুর্বলতা, কমিটির মেয়াদ এবং সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও কমিটি বিলুপ্তির পৃথক কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার পর তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। রাজধানীর মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।

তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তে প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে দলীয় সূত্র।

আরও কয়েকজন নেতা নজরদারিতে

বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলের নাম ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পাওয়া নেতাকর্মীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর প্রয়োজন অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

দলীয় পর্যায়ে এমনও বলা হচ্ছে, শুধু মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী নয়, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের দায়িত্বে থাকা দলের নেতাদের কর্মকাণ্ডও পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ বিরোধ সৃষ্টি কিংবা দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, ইতোমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছেও বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তবে কার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে।

‘পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য’

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, সরকারে থাকার সময়ে দলের নেতাকর্মীদের আচরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, দলীয় কোনো নেতার কর্মকাণ্ডের প্রভাব সরাসরি সরকারের ভাবমূর্তির ওপর পড়ে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, দলের কেউ বিশৃঙ্খলা বা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের চেয়ে আইনের আওতায় আসার বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কেউ অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়াও চলবে।

সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

দলীয় সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, অব্যাহতি এবং কারণ দর্শানোর নোটিশের মতো সিদ্ধান্ত রয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

বিএনপির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। তবে সরকারে থাকার কারণে এবারের পদক্ষেপগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবও বেশি বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

এদিকে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। দলের বিভিন্ন ইউনিটকে শক্তিশালী করা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতাকর্মীদের বিষয়ে কঠোর হওয়ার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

দলীয় নেতাদের মতে, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত বা স্থানীয় কর্মকাণ্ডের প্রভাব শেষ পর্যন্ত দল ও সরকারের ভাবমূর্তিতে পড়ে।

ফলে দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জমি বা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, সালিশের নামে হয়রানি কিংবা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগে থেকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে সাংগঠনিক সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে দলের ভেতরে।

সাম্প্রতিক কমিটি বিলুপ্তি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের ঘটনাগুলোকে তাই বিএনপির চলমান সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিএক্স/রয়েল