নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের নতুন লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের কাছে নতুন আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ উদ্ধার না হওয়া এবং নির্দেশনার পরও হাজার হাজার বৈধ অস্ত্র জমা না পড়ায় নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা পড়েনি ব্যক্তিগত লাইসেন্সের বিপরীতে থাকা ২০ হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র। অন্যদিকে, লুট হওয়া অস্ত্রের কতটি এখনো উদ্ধার হয়নি এবং সেগুলোর কতটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই কতটা কঠোর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
নিবন্ধিত অস্ত্রের ২০ হাজারের বেশি জমা পড়েনি
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ৫৩ হাজার ৭০২টি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত লাইসেন্সের বিপরীতে রয়েছে ৪৮ হাজার ২৮৩টি অস্ত্র।
গত ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা পড়ে ২৭ হাজার ৯৯৫টি অস্ত্র। ফলে জমা না পড়া অস্ত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার ২৮৮টিতে। রাজধানী ঢাকায় নিবন্ধিত ৩ হাজার ৯৯১টি অস্ত্রের মধ্যে ৭৪০টি জমা পড়েনি।
এসব অস্ত্রের বর্তমান অবস্থান, মালিকদের কাছে সেগুলো রয়েছে কি না এবং নির্দেশনা অনুসরণ না করার কারণ বিষয়ে কার্যকর অনুসন্ধান ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
অভ্যুত্থানে লুট হওয়া অস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া যায়। লুট হওয়া অস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অস্ত্র অবৈধভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি বা অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের ঘটনায় লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাও জননিরাপত্তার আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে পুরোনো অস্ত্রের হিসাব, উদ্ধার কার্যক্রম এবং লাইসেন্সধারীদের অস্ত্রের অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন করে অস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
১৫ বছরে দেওয়া হয়েছে ২০ হাজারের বেশি লাইসেন্স
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০ হাজার ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেককে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের পরিবর্তে প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকি, অস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং আইন মেনে চলার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি সামনে আসছে।
‘কয়েকজনের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা বাড়ার শঙ্কা’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. নাঈম আশফাক চৌধুরীর মতে, সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় নতুন বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক সক্ষমতা থাকলেই কাউকে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া উচিত কি না, তা যথাযথভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই বিশ্লেষক।
নতুন লাইসেন্সের আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
নতুন করে বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে জমা না পড়া অস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করা, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ত্বরান্বিত করা, আবেদনকারীর প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রের অপব্যবহার ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে, লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
জননিরাপত্তার স্বার্থে মূল প্রশ্নটি তাই শুধু নতুন অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া নয়, বরং বিদ্যমান অস্ত্রের হিসাব নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা এবং প্রতিটি লাইসেন্সের যৌক্তিকতা ও নিরাপত্তাঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা। পুরোনো অস্ত্রের হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তার পাশাপাশি নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কী ধরনের কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে সেই বিষয়গুলোই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সিএক্স/রয়েল






