ইমাম-পুরোহিতসহ ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মীদের মাসিক সম্মানি, ৯ কারণে হতে পারে বাতিল

চট্টলা ডেক্স:

দেশের মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানি ও উৎসব ভাতার ব্যবস্থা করেছে সরকার। তবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ভঙ্গ হলে এই সম্মানি বাতিলও হতে পারে। এমন ৯টি কারণ উল্লেখ করে নতুন নীতিমালা জারি করেছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও কল্যাণ সহায়তা প্রদান নীতিমালা ২০২৬’ শীর্ষক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে সম্মানি পাওয়ার যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অর্থের পরিমাণ, উৎসব ভাতা এবং সুবিধা বাতিলের কারণগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।

কারা পাবেন সম্মানি

নীতিমালা অনুযায়ী, সম্মানি পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। পাশাপাশি উপজেলা কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার বা গির্জায় কর্মরত থাকতে হবে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তার নিয়োগপত্র থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ এবং অনুমোদিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাই এই সরকারি সহায়তার আওতায় আসবেন।

সরকারের ভাষ্য, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার, সামাজিক মূল্যবোধ গঠন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যেই এই নীতিমালা করা হয়েছে।

কে কত টাকা পাবেন

নীতিমালায় ধর্মভেদে উপাসনালয়ে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য আলাদা মাসিক সম্মানির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

মসজিদে

ইমাম: মাসে ৫ হাজার টাকা

মুয়াজ্জিন: ৩ হাজার টাকা

খাদেম: ২ হাজার টাকা

মোট মাসিক বরাদ্দ: ১০ হাজার টাকা

মন্দিরে

প্রধান পুরোহিত: মাসে ৫ হাজার টাকা

সেবাইত: ৩ হাজার টাকা

মোট মাসিক বরাদ্দ: ৮ হাজার টাকা

বৌদ্ধ বিহারে

প্রধান ধর্মগুরু/বিহার অধ্যক্ষ: মাসে ৫ হাজার টাকা

বিহার উপাধ্যক্ষ: ৩ হাজার টাকা

মোট মাসিক বরাদ্দ: ৮ হাজার টাকা

গির্জায়

প্রধান যাজক: মাসে ৫ হাজার টাকা

সহকারী যাজক: ৩ হাজার টাকা

মোট মাসিক বরাদ্দ: ৮ হাজার টাকা

ধর্মীয় উৎসবে মিলবে ভাতাও

মাসিক সম্মানির পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে এককালীন উৎসব ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

মসজিদে কর্মরত সম্মানিভোগীরা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১ হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা পাবেন।

অন্যদিকে মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জায় কর্মরত সম্মানিভোগীরা যথাক্রমে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিনে ২ হাজার টাকা করে এককালীন উৎসব ভাতা পাবেন।

যে ৯ কারণে বাতিল হতে পারে সম্মানি

সরকারি এই সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি সম্মানিভোগীদের জন্য কিছু বিধিনিষেধও রাখা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী নিম্নোক্ত ৯টি কারণে সম্মানি বাতিল হতে পারে

১. নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলে
নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধ বা ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হলে সম্মানি বাতিল হবে।

২. চাকরি থেকে বরখাস্ত বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে
সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হলে কিংবা নিজে পদত্যাগ করলে সরকারি সম্মানির সুবিধা আর থাকবে না।

৩. তথ্য জালিয়াতি ধরা পড়লে
সম্মানি পাওয়ার জন্য দাখিল করা তথ্য বা কাগজপত্রে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে সুবিধা বাতিল করা হবে।

৪. রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে
কোনো সম্মানিভোগী রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রমাণিত হলে তার সম্মানি বাতিল হবে।

৫. সম্মানিভোগীর মৃত্যু হলে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার নামে দেওয়া সম্মানি স্বাভাবিকভাবেই বাতিল বলে গণ্য হবে।

৬. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত না থাকলে
কেউ সংশ্লিষ্ট মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার বা গির্জায় কর্মরত না থাকা সত্ত্বেও সম্মানিভোগী হিসেবে নির্বাচিত হলে তার সুবিধা বাতিল হবে।

৭. অন্য উৎস থেকে বেতন-ভাতা পেলে
অন্য কোনো সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট, বিদেশি সংস্থা কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বেতন বা ভাতা গ্রহণ করলে এই কর্মসূচির আওতায় সম্মানি পাওয়ার যোগ্যতা থাকবে না।

৮. সমাজবিরোধী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে
সমাজবিরোধী কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সম্মানি বাতিল করা হবে।

৯. রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে
কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে বা সদস্য হিসেবে থাকলে এই কর্মসূচির আওতায় সম্মানি পাওয়ার যোগ্যতা থাকবে না।

থাকছে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ

সরকারি সহায়তা শুধু মাসিক সম্মানি ও উৎসব ভাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন ব্যবহারিক ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সিএক্স/রয়েল