আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মেসি, অশ্রুসিক্ত বিদায়ে শেষ হলো এক মহাকাব্যিক অধ্যায়

চট্টলা এক্সপ্রেস ডেস্ক:

একটি জার্সি, একটি জাতীয় সংগীত, একটি স্টেডিয়াম আর অশ্রুসিক্ত এক কিংবদন্তি সবকিছু মিলিয়ে বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে তৈরি হয়েছিল আবেগঘন এক রাত। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচটি যেন ছিল একটি যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।

বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে জাতীয় দলের হয়ে নিজের দীর্ঘ পথচলার ইতি টানলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিদায়ী ম্যাচেও ছিলেন চেনা ছন্দে। নিজে করেছেন একটি গোল, সতীর্থদের দুটি গোলেও রেখেছেন অবদান। পেনাল্টি থেকে করা ৭১ মিনিটের গোলটিই হয়ে থাকল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ গোল।

ম্যাচের আগেই বোঝা যাচ্ছিল, রাতটি অন্যরকম হতে চলেছে। এজেইজা থেকে মনুমেন্টালের পথে রাস্তার দুই পাশে জমেছিল হাজারো মানুষের ভিড়। জাতীয় দলের বাস থেকে সেই দৃশ্য দেখে আবেগ সামলাতে পারেননি মেসি। চোখের পানি মুছেছেন, হাত নেড়ে জবাব দিয়েছেন সমর্থকদের ভালোবাসার।

স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় তার সঙ্গে ছিলেন তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরো। পরে মাঠে ওয়ার্ম-আপে এসে গ্যালারির চারদিকে হাত তুলে অভিবাদন জানাতেই ৮৫ হাজার দর্শকের কণ্ঠে গর্জে ওঠে মনুমেন্টাল।

এরপর ঘোষকের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সেই পরিচিত নাম আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা, কিংবদন্তি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

জাতীয় সংগীতের সময় আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি। চোখে জল ছিল মেসির, একই আবেগ ছুঁয়ে যায় কোচ লিওনেল স্কালোনিকেও। যে আকাশি-সাদা জার্সিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি জাতির প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও ভালোবাসা বহন করেছেন, সেই জার্সিতে শেষবারের মতো জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

ম্যাচেও মেসির ছাপ

শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে গোল না পেলেও একাধিকবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে তারা। মেসির কয়েকটি প্রচেষ্টা বেনিনের গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেন। একটি ফ্রি-কিকও রক্ষা করেন তিনি।

তবে দ্বিতীয়ার্ধে আর আটকে রাখা যায়নি আর্জেন্টিনাকে।

৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে তৈরি সুযোগে ভলিতে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। মেসির পাশাপাশি এই ম্যাচটি ছিল ওতামেন্দিরও বিদায়ী ম্যাচ। গোলের পর তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন স্কালোনি। গ্যালারি দাঁড়িয়ে সম্মান জানায় তাকেও।

এরপর আবারও মেসির পায়ের জাদু। বাঁ দিক থেকে তার বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণ করে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে জালে পাঠান নিকো পাজ। বিদায়ী ম্যাচে সতীর্থের দুই গোলে সরাসরি অবদান রাখলেন মেসি।

৬৮ মিনিটে বেনিনের বক্সে ফাউলের শিকার হন অগাস্টিন জিয়াই। পেনাল্টির সিদ্ধান্ত আসে আর্জেন্টিনার পক্ষে। ৭১ মিনিটে স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। ঠান্ডা মাথায় বল পাঠিয়ে দেন জালে। গোলরক্ষক সঠিক দিকে ঝাঁপিয়েও পারেননি তাকে থামাতে।

জাতীয় দলের হয়ে সেটিই হয়ে থাকে মেসির ১২৬তম গোল।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোলের খোঁজে ছিলেন তিনি। ৭৫ মিনিটে সহজ একটি সুযোগ হাতছাড়া করেন। ৮৯ মিনিটে তার বাঁ পায়ের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। যোগ করা সময়েও ফ্রি-কিক পেয়েছিলেন, কিন্তু সেটিও গোল হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।

শেষ বাঁশিতে শেষ হলো একটি যুগ

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থরা ঘিরে ধরেন মেসিকে। বেনিনের খেলোয়াড়েরাও এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানান। মনুমেন্টালের গ্যালারিতে তখন শুধুই আবেগ, ভালোবাসা আর বিদায়ের মুহূর্ত।

২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক। এরপর দীর্ঘ ২১ বছরের যাত্রায় মেসি দেখেছেন সবকিছু ব্যর্থতা, তীব্র সমালোচনা, চোখের জল, একের পর এক ফাইনালে হতাশা। আবার সেই তিনিই আর্জেন্টিনাকে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।

৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২২ সালে বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তোলার পর পূর্ণতা পেয়েছিল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়।

সেই গল্পের শেষ পাতাটিও লিখলেন তিনি নিজের মতো করেই—গোল, অ্যাসিস্ট এবং জয় দিয়ে।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ পরিসংখ্যান:

ম্যাচ — ২০৭

গোল — ১২৬

অ্যাসিস্ট — ৬৮

আকাশি-সাদা জার্সিতে হয়তো আর দেখা যাবে না তাকে। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসির নামটি থেকে যাবে একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং একটি পুরো প্রজন্মের স্বপ্নের নাম হয়ে।

সিএক্স/রয়েল